সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮ ০৬:২৭:৩০ পিএম

নির্মাণের আগেই ব্যয় বাড়ছে পদ্মা রেলসেতুর

জাতীয় | সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০২:৫৩:২৭ পিএম

পদ্মা সেতু চালুর প্রথম দিন থেকেই ট্রেন ও সড়কযান চলার কথা। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে চললেও পদ্মা রেলসেতু নির্মাণের খবর নেই। চীনের মাধ্যমে জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের কথা প্রকল্পটির। এখনো ঋণচুক্তি না হলেও প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে। ফলে নির্মাণ শুরুর আগেই ৩৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াচ্ছে। কমে যাচ্ছে চীনের প্রতিশ্রুত ঋণের পরিমাণও। তাই বাড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত উৎস থেকে বরাদ্দের পরিমাণ। সব মিলিয়ে ১৪.৫৫ শতাংশ বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে কাজ শুরুর আগেই।

সরকারের টার্গেট ছিল, ২০১৮ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার। অথচ এ সময়ের মধ্যে শুরু করা নিয়েই সংশয় আছে। আরও ২ বছর বাড়ছে প্রকল্পের মেয়াদ। ২০২৪ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার আপাতত পরিকল্পনা নিয়ে সংশোধন করতে হচ্ছে ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল)। আবার নির্মাণকাজ পেছানোয় বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা যাচ্ছে না। তাই রেলওয়ের আরএডিপি (সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়নের অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ কম হবে। জাতীয় অর্থনীতিতেও এর একটি বড় প্রভাব ফেলবে।

রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক এ বিষয়ে বলেন, এটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। দ্রুত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ঋণচুক্তির জন্য দফায় দফায় তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য বহুবার অনুরোধ-তদবির করা হয়। এখন ঋণচুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। আশা করি খুব শিগগির চুক্তিশেষে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাবে।

রেলমন্ত্রী আরও বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে সবাই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। এরপরও সময়ের ব্যবধানে যদি খরচ কিছুটা বাড়ে তাহলে সেটি আমাদের কারণে নয়।

একই বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ঋণচুক্তির বিলম্ব নয়; মূলত দেরিতে কাজ শুরু হলে ব্যয় বাড়তে পারে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, যথাসময়ে নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে। এরমধ্যে আরেকটি বড় ধাক্কা চীনের ঋণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন। কমানো হয়েছে ঋণের পরিমাণ। এতে করে বেড়ে গেছে সরকারি উৎস থেকে বরাদ্দের পরিমাণ। সময়মতো কাজ শুরু করতে না পারায় খরচের খাতায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন উৎস। এর মধ্যে রয়েছে জমি অধিগ্রহণের নতুন আইনের কারণে ক্ষতিপূরণের হার, নির্মাণকাজের আয়কর বৃদ্ধি, পরামর্শক, অফিস-বেতন খরচসহ নানা দিক। অর্থাৎ মূল কাজ শুরু করতে না পারার খেসারত দিতে হচ্ছে পদে পদে।

সূত্র জানিয়েছে, ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকার এ মেগা প্রকল্পে বার্ষিক দুই শতাংশ সুদে চীনের ঋণ দেওয়ার কথা ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। বাকি ১০ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার জোগান দেওয়ার কথা বাংলাদেশ সরকারের (জিওবি); কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু না করা এবং চীনের ঋণপদ্ধতির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে এখন প্রকল্পব্যয় ধরা হচ্ছে ৪০ হাজার ৮০ কোটি টাকা। নতুন করে চীনের ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা আর ১৯ হাজার ৪৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে জিওবি ফান্ড থেকে। নির্মাণকাজের ৮৫ শতাংশ অর্থ (২৬৬৭.৯৪ মিলিয়ন ডলার) খরচ হবে প্রিফারেনসিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) থেকে। এটি ঋণের অংশ। অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার। অথচ ইপিসি চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণের ১০০ ভাগই দেওয়ার কথা ছিল চীনের এক্সিম ব্যাংকের। ফলে বৈদেশিক ঋণ বরাদ্দের পরিমাণও কমে গেছে। মানে ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটির স্থলে এখন হবে ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, ইপিসি মানে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। প্রকল্পের ডিজাইন, কেনাকাটা এবং নির্মাণকাজ সবই করবে ঠিকাদার। পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পে চীন নিযুক্ত ঠিকাদার হচ্ছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড (সিআরইসি)।

বাড়ছে জমি অধিগ্রহণ ও আয়কর

ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ব্যয় বাড়ছে পদ্মা রেলসেতুতে। নতুন ভূমি অধিগ্রহণ আইন জারির কারণে জমির বাজারদরের তিনগুণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাই অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় বাড়ছে। তা ছাড়া বাড়াতে হচ্ছে জমি অধিগ্রহণের পরিমাণও। এই প্রকল্পের ডিপিপিতে প্রথমে ২০০ একর জমি ধরা হয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে ৬৮ একর আন্তঃবিভাগীয় পরিবর্তনের চিন্তায়; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ১৭৮৬ একর বেসরকারি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, সওজের ২০০ একর এবং সেতু কর্তৃপক্ষের ৫০ একর অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে। এতে অধিগ্রহণের জমির পরিমাণ ১৭০০ একর থেকে বেড়ে ২০৩৬ একরে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য ২৮৫৩ কোটি টাকা থেকে ৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা ধরতে হচ্ছে। পুনর্বাসন খাতের খরচ ৫৬৬ কোটি থেকে ৭২৯ কোটিতে দাঁড়াচ্ছে। ফলে অধিগ্রহণ আইনের পরিবর্তন এবং অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে ৩৪৭৮ কোটি টাকা ধরতে হচ্ছে। মানে অধিগ্রহণ খাতেই ৯.৯৪ শতাংশ ব্যয় বাড়ছে। তা ছাড়া আয়কর হার নতুন করে নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সাড়ে ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশ। প্রকল্প অনুমোদন পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের কারণে কেবল ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ ২৯০৩ কোটি থেকে ৩৮৬২ কোটি টাকা হচ্ছে।

আরও গাড়ি কেনা হচ্ছে

ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং প্রকল্পের নির্মাণকাজের জন্য আরও ২টি মাইক্রোবাস কেনা হচ্ছে। ফলে ১১ কোটি টাকার খরচ এখন ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। মানে ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বাড়ছে গাড়ি বাবদ। আগে ৬টি জিপ, ৬টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৪টি মাইক্রোবাস ধরা হয়েছিল। এরসঙ্গে আছে অফিস উপকরণ বাবদ ১৫ লাখ, ফার্নিচার বাবদ ১৪ লাখ টাকা। এজন্য মোট ১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ ধরতে হচ্ছে।

মেয়াদ বৃদ্ধিতে খরচ বাড়ছে

নতুন করে রেল সংযোগ নির্মাণকাজ শুরুর সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে চলতি বছরের ১ জুলাই। আর কাজ শেষ করার সময় ধরা হয়েছে ২০২৩ সাল। এর মধ্যে এক বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড। ঠিকাদার এবং পরামর্শকের চূড়ান্ত রিপোর্ট সম্পন্ন করতে বর্তমান হিসাবেই ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময় ধরতে হচ্ছে। অথচ ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারিতে পরামর্শক নিয়োগের চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হবে; কিন্তু আজও ঋণচুক্তি হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ, ঠিকাদারের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম, টপোগ্রাফি ও জিওটেকনিক্যাল সার্ভেসহ নানা কাজ করতে হচ্ছে এ সময়ে। কনস্ট্রাকশন সুপারিভশন কনসালটেনসির (পরামর্শক) সময় বাড়ায় কেবল এ খাতে ৯০ কোটি টাকা বাড়ছে। তা ছাড়া প্রকল্পকাল ২ বছর বেড়ে যাওয়ায় জনবল (বেতন) খরচও বাড়ছে ১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। একই কারণে রক্ষণাবেক্ষণ খরচেও অতিরিক্ত টাকা যাবে। শুধু তাই নয়, পরিসেবা সংযোগ খরচও বাড়ছে। এর সঙ্গে জ্বালানি খরচ, বিভিন্ন কমিটির সম্মানী সবক্ষেত্রেই নতুন করে বাড়তি অঙ্ক ধরতে হচ্ছে। এ জন্য ১৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বাড়ছে। প্রকল্পের বিলম্বতায় ফিজিক্যাল এবং প্রাইস কনটিনজেনসি খরচও বাড়ছে। সবমিলিয়ে গোটা প্রকল্পে ৫ হাজার ৯১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ছে।

খরচ হচ্ছে না বরাদ্দকৃত টাকা

পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা যাচ্ছে না। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ঠিকাদারকে ২০ শতাংশ অগ্রিম প্রদান ছাড়াও মালামাল সরবরাহ ও নির্মাণকাজের জন্য ব্যয় এবং সিডি-ভ্যাট বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়। পরে শুধু ঠিকাদারের ২০ শতাংশ অগ্রিম বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। কারণ কর্ণফুলী টানেলে ঋণচুক্তির পরও অর্থছাড় হতে এক বছর পার হয়। তাই পদ্মা রেলসেতুতে এখনো ঋণচুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় এই অর্থ খরচ কঠিন হয়ে গেছে। তাই নির্মাণকাজে প্রস্তাবিত ৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া নির্মাণকাজ শুরু না হলে ডিজাইন রিভিউ এবং সুপারভিশনের জন্য বৈদেশিক পরামর্শক মোবিলাইজ করার দরকার হবে না। এতে পরামর্শক খাতে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে না। তা ছাড়া নির্মাণ শুরু না হওয়ায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিটে এ মুহূর্তে আরও জনবল নিয়োগের সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রেও সব টাকা খরচ হচ্ছে না। তাই প্রকল্পের আরএডিপিতে প্রাক্কলিত ৬ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার মধ্যে ৫ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বরাদ্দ কমিয়ে ৯৯৩ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যদিও প্রস্তাবটি নাকচ করে আগের বরাদ্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়। এর কারণ ঋণচুক্তি ও নির্মাণকাজ শুরুর আশা।

সূত্র: আমাদের সময়

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন