বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ ১০:৫৬:২৮ এএম

টাইগারদের ভরাডুবির নেপথ্যে

খেলাধুলা | বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৫:৫৫:২৪ এএম

পেপ গার্ডিওলা বায়ার্ন মিউনিখে যাওয়ার পর বার্সেলোনার কী অবস্থা হয়েছিল? লিওনেল মেসি, আন্দেজ ইনিয়েস্তা, জাভি আলনসো, জেরার্ড পিকের মতো মহাতারকারা থাকার পরও খাদে পড়েছিল স্প্যানিশ ক্লাবটি! চন্ডিকা হাতুরাসিংহে শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার পর কী বাংলাদেশ দলেরও একই অবস্থা হয়ে গেল নাকি?

তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাশরাফিরা থাকার পরও কেন ঘরের মাঠে বাংলাদেশের এই ভরাডুবি! ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো ‘টেস্ট সম্রাট’দের হারিয়েছে বাংলাদেশ। যে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে সদ্য নাস্তানাবুদ হয়ে গেল সেই শ্রীলঙ্কাকেই কিন্তু তাদের মাটিতে নাজেহাল করেছিল এই বাংলাদেশ! ঐতিহাসিক শততম টেস্টে কী অসাধারণ জয়। সেবার লঙ্কানদের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ও টি-২০ সিরিজেও হারেনি বাংলাদেশ।

টাইগারদের জয়রথটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ থেকে। তার আগে টাইগাররা জয় পেত কালেভদ্রে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন মাশরাফিরা। তারপর ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়েছিল টাইগাররা। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়।

ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত সব শেষ আইসিসির টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। যেখানে একই গ্রুপে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দল ছিল। ক্রিকেটে সাফল্যের গ্রাফটা যখন ঊর্ধ্বমুখী তখনই হঠাৎ ছন্দপতন। কেন ঘরের মাঠে বাংলাদেশের এই ভরাডুবি?

‘এক্স-ফ্যাক্টর’ অবশ্যই চন্ডিকা হাতুরাসিংহে! বাংলাদেশের ক্রিকেটে লঙ্কান এই কোচের অবদানের কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে এই ভরাডুবির পেছনের রহস্য নিয়ে ‘ব্যবচ্ছেদ’ করতে গেলেও সামনে চলে আসবে হাতুরার নাম!

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ছন্দপতন শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্রোটিয়াদের দেশে খেলতে গিয়েছিল টাইগাররা। যাওয়ার আগে টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম বলেছিলেন, ‘এবার আমরা এমন কিছু করতে চাই, যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

দলের প্রতি কতটা আত্মবিশ্বাস থাকলে একজন অধিনায়ক দেশ ছাড়ার আগে এমন কথা বলার সাহস রাখেন! কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পর মুশফিকই প্রথমে সংবাদ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় ফিল্ডিং করতে বাধ্য করেন কোচ! তারপর থেকেই দলের ভিতরের চিত্রটা বাইরে চলে আসে!

হয়তো দলের ভিতরের কথা মিডিয়াকে বলা ঠিক হয়নি মুশফিকের। কিন্তু তাই বলে একজন অধিনায়ককে এমনভাবে নির্দেশ দিতে পারেন কোনো কোচ? একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হাতুরা ইচ্ছাকৃতভাবেই কাজটি করেছিলেন। কেন না দক্ষিণ আফ্রিকায় বসেই শ্রীলঙ্কার কোচ হওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলেছিলেন তিনি। তাই দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার এক অজুহাত খুঁজছিলেন। কেন না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড হাতুরাকে যে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, বিশ্বের কোনো বোর্ড তাদের কোচকে এমন ‘সুপার পাওয়ার’ দিয়ে রাখে কিনা তাতে সংশয় রয়েছে!

হাতুরার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি ছিল ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত। কিন্তু লঙ্কান কোচের মননে মগজে ছিল প্রিয় দেশ ‘শ্রীলঙ্কা’। তাই বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার জন্য তার সামনে তো একটা অজুুহাত চাই। সে কারণেই হয়তো মুশফিককে খোঁচা দিয়েছেন প্রথমে।

হাতুরাসিংহে কেবল অসাধারণ মেধাবীই নন, ভয়ঙ্কর রকম চতুরও বটে! তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের বোর্ডে অদূরদর্শিতার কারণে মেরেছেন তিন পাখি! মুশফিকের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে তিনি একদিকে যেমন বোর্ডের সঙ্গে মুশফিকের দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছেন, অন্যদিকে দলের ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করে দিয়ে সটকে পড়েছেন। তৃতীয়ত, হাতুরা জানতেন শ্রীলঙ্কার হয়ে তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট বাংলাদেশেই। তাই এই সফরে সফল হতে হলে বাংলাদেশ দলের মধ্যে একটা অস্থিরতা তৈরি করতে হবে। তাই করেছেন।

হাতুরার ফাঁদে পা দিয়ে বিসিবিও বাংলাদেশের সিনিয়র ক্রিকেটারদের প্রতি বিরাগভাজন হয়েছে। মুশফিককে টেস্টের অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তাকে উইকেটকিপিং থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এক কথায় বোর্ড মুশফিককে আন্ডার প্রেসারে রেখেছে। এমন অবস্থা মুশফিকের কাছে কি আর ভালো পারফরম্যান্স আশা করা যায়! হাতুরার ভাগ্য খুবই ভালো! তাই তো এমন সময়ই কিনা দলের সেরা পারফর্মার সাকিব আল হাসান ইনজুরিতে পড়লেন। তা না হলে হয়তো বাংলাদেশ দলের এমন শোচনীয় অবস্থা হতো না।

বাংলাদেশে এসে প্রথম দুই ম্যাচে বাংলাদেশের উড়ন্ত জয় দেখে যেন খানিকটা ভড়কেই গিয়েছিলেন হাতুরা! কোচ না থাকার পরও এত চমৎকার খেলতে পারে একটি দল। কিন্তু এরপরই পরিকল্পনার অভাবে খাদে পড়ে গেল বাংলাদেশ। ত্রি-দেশীয় সিরিজের ফাইনালে হার। অতঃপর টেস্ট সিরিজে পরাজয়। টি-২০তে আত্মবিশ্বাসের অভাবেই হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ।

সব কিছুর পরও এমন শোচনীয় অবস্থার দায়টা ক্রিকেটারদের কাঁধেই বর্তায়। কেন না বাংলাদেশ এখন পেশাদার দল। ক্রিকেটাররাও পেশাদার। তাই ভিতরের দুর্বলতা কেন বাইরে প্রকাশ পেল! কেন সব কিছু বুকে চাপা রেখে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য তারা সেরা পারফর্ম করে লঙ্কানদের উড়িয়ে দিতে পারলেন না?

তবে এটা ভাবার উপায় নেই যে, এই একটা দুইটা সিরিজেই এদেশের ক্রিকেট শেষ হয়ে গেছে! বাংলাদেশ দলে এখন এক একজন ক্রিকেটার এক একটি রত্ন! হিরা, চুনি, পান্না, মণি, মুক্তা, জহরতদের নিয়েই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এখন এই রত্নগুলো একত্রে করার জন্য একজন ভালো কোচ দরকার। প্রভাবশালী কোচ। যিনি বাংলাদেশের দলের গ্রাফটাকে আবার ঊর্ধ্বমুখী করে দেবেন। -বিডি প্রতিদিন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন