বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ০৯:২৭:০৭ এএম

‘আমার মৃত্যুর জন্য হৃদয় দায়ী, স্যরি আম্মু, মাফ করে দিও’

জেলার খবর | সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০১:৫৯:৫২ এএম

`আমার মৃত্যুর জন্য হৃদয় দায়ী। স্যরি আম্মু, মাফ করে দিও।’ এসএসসি পরীক্ষার্থী মেহিয়া আক্তার বাবলি তার মৃত্যুর জন্য হৃদয় নামের এক ছেলেকে দায়ী করে একটি চিরকুটে এমনটাই লিখে গেছে।

মেহিয়া আক্তার বাবলি ভারতেশ্বরী হোমস থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। দুটি পরীক্ষা বাকি থাকা অবস্থায় বাবলি বুধবার রাতে মির্জাপুর উপজেলা সদরের বাইমহাটী গ্রামের লোকমান হোসেনের ভাড়া বাসায় ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।

জানা গেছে, মেহিয়া আক্তার বাবলি ও তার সহপাঠী আছিয়া খাতুন জয়া ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী। জয়া বিক্রমপুরের লৌহজং এলাকার কলাপাড়া গ্রামের রফিক মিয়ার মেয়ে। মেহিয়া আক্তার বাবলির মা পারুল বেগম ঢাকায় পার্লারের ব্যবসা করেন। স্বামী পরিত্যক্তা পারুল বেগম দ্বিতীয় স্বামী নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন।

গত মঙ্গলবার বাবলির মা ফোনে জয়ার মা ফাতেমাকে ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে বাবলিকে ঢাকায় তার কাছে পাঠাতে বলেন। পরে ফাতেমা বেগম বাবলিকে টাকা দিলে বিকেল ৩টায় ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়।

বুধবার সন্ধ্যায় বাবলি মির্জাপুরের ভাড়া বাসায় ফিরে আসে এবং ড্রেস পরিবর্তনের কথা বলে মোবাইলে কথা বলতে বলতে তার কক্ষে ঢুকে। সময় বেশি নেয়ায় ফাতেমা ও তার মেয়ে জয়ার সন্দেহ হয়। পরে বাসার মালিককে খবর দিলে দরজা ভেঙে বাবলির ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান তারা। খবর পেয়ে মির্জাপুর থানা পুলিশ বাবলির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

রবিবার সকালে বাসার মালিক বাবলির ফাঁসি দেয়া কক্ষটি পরিষ্কার করতে গেলে বাবলির ক্লাসের একটি খাতা দেখতে পান। পরে খাতার পাতা উল্টে একটি চিরকুট পান। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘আমার মৃত্যুর জন্য হৃদয় দায়ী। স্যরি আম্মু…. মাফ করে দিও।’

আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে বাবলির মা পারুল বেগম বাদী হয়ে বাবলির সহপাঠী আছিয়া আক্তার জয়া, তার মা ফাতেমা আক্তার সুমি ও হৃদয়কে আসামি করে থানায় মামলা করেন।

মির্জাপুর থানা পুলিশ এ মামলায় বাবলির সহপাঠী জয়ার মা ফাতেমা আক্তার সুমিকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মির্জাপুর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) খোকন কুমার সরকার বলেন, চিরকুট পাওয়ার বিষয়টি শুনেছি। তবে এখনো হাতে পাইনি। চিরকুট পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, জন্মের ছয় মাসের মাথায় বাবলীকে অ্যাসিড পান করিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল তার বাবা। এর ১৭ বছর পরে বুধবার রাতে অবশেষে আত্মহত্যা করলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী সেই মেহিয়া আক্তার বাবলী।

বাবার সেই অ্যাসিড আক্রমণ থেকে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিলেন বাবলী। তবে শারীরিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন – কথা বলতেও পারতেন না ঠিকমত। তবে নানা মানুষের সহায়তায় ভর্তি হতে পেরেছিলেন টাঙ্গাইলের নামকরা একটি স্কুলে।

বাবলীর মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেয়ার ঘটনা এক সময় মানুষ জেনেছিল গণমাধ্যমের কল্যাণে। আলোড়িত তুলেছিল ঐ ঘটনা।

সেই সময় থেকে পেশাগত কারণে বাবলীর পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন বাবলীর জীবনের কাহিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ সাংবাদিক জানান, কন্যাসন্তান হওয়ার তথ্য জেনে জন্মের আগে থেকেই বাবলীর মা’কে গর্ভপাত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন বাবলীর পিতা।

তিনি বলেন, কন্যাসন্তান হিসেবে জন্ম হওয়ার ছয় মাসের মাথায় অ্যাসিড দিয়ে বাবলীকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। ঐ সময় এ নিয়ে মামলা হলে কিছুদিন পলাতক থাকেন বাবলীর পিতা। কিন্তু পরে ঐ মামলার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাবলী এবং তার মা এরপর আর তার সাথে সম্পর্ক রাখেননি।

অ্যাসিড হামলায় ঐ সময় বাবলীর একটি কান নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়াও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় গলা, জিহ্বা ও মুখ।

ঐ সাংবাদিক জানান বাংলাদেশ অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তির সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল বাবলী। শারীরিক বিকলঙ্গতার জন্য প্রায়ই অন্যান্য ছাত্রীদের বিদ্রুপের শিকার হতে হতো তাকে।

পুলিশ বলছে, তাদের ধারণা বাবলী আত্মহত্যা করেছেন। তবে কেন এই ঘটনা ঘটেছে, ময়নাতদন্তের পরে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন