বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮ ০৫:৪১:৪১ পিএম

অদৃশ্য সিগন্যালের অপেক্ষায় রাজনীতি!

জাতীয় | সোমবার, ৫ মার্চ ২০১৮ | ০৫:২৫:১০ পিএম

জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে দেশের রাজনীতিতে ঘুরপাকের লক্ষণ ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেমন মিত্র বাড়ানোর চেষ্টা করবে, তেমনি ক্ষমতার বাইরের মূল রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিও নিজেদের পক্ষে নতুন শক্তি সমাবেশ ঘটানোর জন্য তৎপর হবে– এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক হিসাব।

প্রশ্ন হলো, বর্তমান যে জোট- মহাজোট আছে তার আকার বাড়বে অর্থাৎ তাতে নতুন দলের নাম যুক্ত হবে, নাকি অন্য প্রক্রিয়ায় নতুনদের সংযোজন ঘটবে? তলে তলে নানা ধরনের তৎপরতাই চলছে। তবে এসব মেরুকরণ চূড়ান্ত রূপ পেতে আরও কিছু সময় লাগবে। নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ এখনও চলছে। শুধু জাতীয় রাজনীতি নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলাও নির্বাচনকে ঘিরে চলবে। বাইরের কোন শক্তি কীভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্ষমতাকাঠামো দেখতে চায় তাও দেখার বিষয় আছে।

বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের কতটুকু মাথাব্যথা আছে কিংবা আদৌ আছে কিনা– সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাইরের দুনিয়া মনে নেবে না, চাপের মুখে সরকার দ্রুত একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে বলে যারা মনে করেছিলেন তারা কিন্তু হতাশ হয়েছেন। একতরফা নির্বাচনে যে সরকার গঠিত হলো সে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে কারো কোনো সমস্যা হয়নি। আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে বহির্বিশ্বে কারো মাথায় বাজ পড়বে বলে মনে হওয়ার কোনও কারণ আছে কি?

সরকার গঠিত হলে, সেই সরকার শাসন কাজ পরিচালনায় ব্যাপক গণবিদ্রোহের মুখে না পড়লে বাইরের দেশগুলো এখন সাধারণত খুব একটা নাক গলায় না। কারণ, ‘বিশুদ্ধ’ গণতন্ত্র নিয়ে দুনিয়ায় এখন আর তেমন মাতামাতি নেই। সবাই এখন ‘বাণিজ্যিক’ ধান্ধায় ব্যস্ত, স্বার্থচিন্তায় মশগুল, আদর্শিক অবস্থান নিয়ে কে আর মাথা ঘামাচ্ছে! গণতন্ত্র নিশ্চয়ই উত্তম শাসন। কিন্তু পৃথিবীর অধিক সংখ্যক মানুষই এখনও অগণতান্ত্রিক শাসনে অভ্যস্ত।

বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া না-নেওয়ার ওপর রাজনীতির মেরুকরণ নির্ভর করবে অনেকাংশে। বিএনপি যদি ক্রমাগত বলতে থাকে যে তারা বর্তমান সরকারের অধীনে এবং খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যে রাজনীতির চিত্র কিছুটা পাল্টে যেতে পারে। বিএনপি যে নির্বাচন ঠেকানোর ক্ষমতা রাখে না– এটা সবারই বোঝা হয়ে গেছে।

তাই বিএনপিকে ছাড়াই দেশে আরও একটি নির্বাচন হচ্ছে– এটা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠলে রাজনীতিতে মেরুকরণ দ্রুততর হবে। জাতীয় পার্টি সেক্ষেত্রে নতুনরূপে সামনে আসতে পারে। জাতীয় পার্টি তখন বিরোধী দলের ভূমিকায় নামবে। বিএনপি থেকে কেউ কেউ তখন জাতীয় পার্টিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে পারেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্প্রতি বিএনপি থেকে অনেকেই তার দলে যেতে চাচ্ছেন বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা একেবারে তাৎপর্যহীন নয়।

তাছাড়া গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারপারসন রওশদ এরশাদ সংসদে যে ভাষণ দিয়েছেন তাও একেবারে শুধু শুধু মনে করার কারণ নেই। চার বছর পরে এসে নিজেদের পরিচয় সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলে রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির সম্মান বাঁচাতে মন্ত্রিসভা থেকে দলটির সদস্যদের পদত্যাগ করার নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা সরকারি দল, না বিরোধী দল, কোনটা আমরা?’

এই পরিচয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসার খায়েশ এতদিন পরে হওয়ার পেছনেও যে রাজনীতি আছে তা কারও না বোঝার কথা নয়। বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলেও ২০১৪ সালের মতো একটি ভোটারবিহীন বা নামকাওয়াস্তে নির্বাচন সরকার করতে চাইবে না। সেক্ষেত্রে গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে যে রকম ধরেবেঁধে নির্বাচনে নামানো হয়েছিল, এবার তা না হয়ে নতুন একটি জোট নিয়ে এরশাদ নির্বাচনের মাঠে থাকবেন।

এমনকি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এখন আওয়ামী লীগের মহাজোটে নাম লেখাতে চাইছেন, তিনিও এরশাদের সঙ্গে ভিড়তে পারেন। আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এবং অন্য ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত দলীয় নাম ও প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবে না। তারা যদি বিএনপি জোটে থেকে ভোট করে তাহলে একরকম চিত্র হবে। আর তারা যদি স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে ভোট করে তাহলে হবে ভিন্ন চিত্র।

জামায়াত এবং ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগ তথা সরকারের একটি গোপন সমঝোতার যে কথা শোনা যাচ্ছে তা যদি সত্য হয় তাহলেও রাজনীতির মেরুকরণ নতুন মাত্রা পাবে। আওয়ামী লীগ এই শক্তিকে নিজেদের পক্ষে পেতে না চাইলেও নিশ্চয়ই চাইবে যে নির্বাচনে তারা যেন বিএনপির ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। ‘ধর্মীয়’ ভোট যদি আলাদা মার্কা বা বাক্সে পড়ে তাহলেও আওয়ামী লীগের লাভ।

বিএনপিকে কৌশল এগুতে হবে। যেকোনও ঘটনা দলটির অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলতে পারে। জামায়াতকে জোটে রাখার জন্য তোষামোদ না করে বিএনপি যদি জামায়াতকে বাদ দেয় তাহলে তার পক্ষে নতুন শক্তি সমাবেশ ঘটতে পারে। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্নারা যে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলেছেন, সে ফ্রন্টেরও বিএনপির দিকে ঝোঁকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে তাদের জামায়াতে আপত্তি আছে। এমনকি জামায়াত ছাড়লে সিপিবি-বাসদ-বাম মোর্চার নৈতিক সমর্থনও বিএনপি পেয়ে যেতে পারে।

তবে বিএনপিতে জামায়াতের পক্ষে একটি বড় লবিং আছে। তারা হয়তো মনে করতে পারে, জামায়াতকে এখনই দূরে ঠেলে দেওয়াটা বিএনপির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে যেতে পারে। অবশ্য জামায়াত সিদ্ধান্ত নেবে নিজেদের বিবেচনা থেকেই। বিএনপির কিসে ভালো হবে সেটা জামায়াত দেখবে না। তারা তাদের ভালোটাই দেখবে। এখন বিএনপির সঙ্গে থাকা যদি জামায়াত তাদের জন্য ক্ষতিকর মনে করে তাহলে তারা কি বিএনপির মাথায় ছাতা ধরবে? মনে হয় না।

রাজনীতিতে বাইরে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তা দেখেই পুরোটা বোঝা যাবে না। নেপথ্যে কী ঘটছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন দিক থেকে কোন ‘সিগন্যাল’ আসে তার দিকে সবারই গভীর মনোযোগ। এখন পর্যন্ত এমন কোনও সম্ভাবনা বা আশঙ্কার কথা কোনও মহল থেকে শোনা যায়নি যা থেকে মনে হতে পারে আগামী নির্বাচনে সরকার বদল ঘটে যাবে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির জনসমর্থন কাছাকাছি হলেও সব দিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগ এখন বিএনপির তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।

ক্ষমতাসীনদের প্রতি সাধারণ যে বিরুদ্ধ জনমত থাকে সেটা ছাড়া আওয়ামী লীগের আর কোনও নেতিবাচক ফ্যাক্টর নেই। দলের মধ্যে বিরোধ-কোন্দল আছে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও আছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাননীয় প্রধামমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাই এখন দলের বড় সম্পদ। তার ভাবমূর্তি এখন বিশ্বনেতার পর্যায়ে। তার নেতৃত্বগুণের প্রশংসা তার বিরুদ্ধপক্ষও না করে পারছে না। তিনি পরিশ্রমী এবং মেধাবী। যেকোনও সংকট মোকাবিলায় তিনি যে সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছেন তার কোনও তুলনা নেই। দলের জন্য ভোট সংগ্রহে তিনি রাখবেন নিয়ামক ভূমিকা।

অন্যদিকে বিএনপিতে চলছে বিশৃঙ্খলা, চরম নেতৃত্ব সংকট। বাহ্যত ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও বিএনপি এখন বাস্তবে ভঙ্গুর দশায় পড়েছে। দুর্নীতির মামলায় শাস্তি হওয়ায় দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার ইমেজে যে কালিমা লাগলো তা সহজে দূর হবে না। বিএনপি বিদেশিদের কাছে বেগম জিয়ার মামলা নিয়ে নালিশ জানাচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কোনও খবর নেই। বিদেশিরা বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ পায় তেমন কিছু করবে বলে মনে হয় না। বিএনপি একদিকে সব ধরনের আইনি সুযোগ গ্রহণ করছে, অন্যদিকে আইন আদালতের বাইরে আন্দোলনও করছে। মানুষের সহানুভূতি খালেদা জিয়ার প্রতি বাড়ছে বলে বিএনপি নেতারা যে দাবি করছেন তারও কোনও বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।

লন্ডনে বসে তারেক রহমান ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলে যেসব খবর প্রচার হচ্ছে সেসবও বিএনপির কোনও উপকারে আসছে বলে মনে হচ্ছে না। বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কোনও ধরনের বাগাড়ম্বরে না জড়িয়ে বিএনপির উচিত নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হলেও বিএনপির রাজনৈতিকভাবে মুখরক্ষা হবে। আর না হলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব অবশ্যই বিএনপির। বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: কলামিস্ট

বি:দ্র : প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। এমটিনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য এমটিনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন