মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮ ০১:১৪:১৫ এএম

দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার পর এ হামলা

শিক্ষাঙ্গন | মঙ্গলবার, ৬ মার্চ ২০১৮ | ১২:২৬:১৩ পিএম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা করতে দীর্ঘ পরিকল্পনা করে ফয়জুল হাসান। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া শুরু করে সে। জাফর ইকবালের ওপর নজরদারি করতে এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে খেলাধুলা শুরু করে। ঘটনার দিন সকালেই ক্যাম্পাসে আসে ফয়জুল। এদিন দুপুরে জাফর ইকবালকে একটি অনুষ্ঠানে দেখার পর তার মনে হয় এখনই হামলার উপযুক্ত সময়। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কালো টি শার্ট পরে অংশ নেয়। সন্দেহ এড়াতে বাসা থেকে কালো টি শার্ট পরে আসে ফয়জুল। সঙ্গে নিয়ে আসে একটি ছুরি। তারপর জাফর ইকবালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ করেই জাফর ইকবালের ওপর অতর্কিত হামলা করে ফয়জুল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পুরো ঘটনা অকপটে স্বীকার করেছে হামলাকারী জঙ্গি ফয়জুল। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র আরও জানায়- ফয়জুলের দাবি, জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু। এ কারণে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় সে। জাফর ইকবাল সম্পর্কে সে ফেসবুক এবং ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। হামলাকারী ‘স্বপ্রণোদিত’ হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এ হামলার দায় কোনো জঙ্গি সংগঠন স্বীকার করেনি। ফয়জুল কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেনি। তবে ফয়জুল স্বপ্রণোদিতভাবে হামলা করেছে এখনই এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলতে রাজি নন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। সে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সদস্য কিনা এবিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে ফয়জুল দাবি করেছে, নিজেই উদ্বুদ্ধ হয়ে জাফর ইকবালের ওপর হামলা করেছে। হামলার ধরন দেখেও মনে হয়নি ফয়জুল প্রশিক্ষিত। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ফয়জুল ‘সেলফ মোটিভেটেড জঙ্গি’। তদন্ত শেষ হলেই জানা যাবে ফয়জুল একা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, নাকি এর পেছনে কোনো জঙ্গি সংগঠন বা কোনো গোষ্ঠী জড়িত। তবে ফয়জুলের জঙ্গি হয়ে উঠার পেছনে পারিবারিক শিক্ষা এবং ধর্মান্ধতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী সোমবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এ ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। হামলাকারী অসুস্থ থাকায় তাকে এখনও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। আমরা তার পরিবারের সদস্যদের আটক করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা যা জানি তা হল, হামলাকারী (ফয়জুল হাসান) নিজে নিজেই জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। আমরা অবশ্যই এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করব। এর পেছনে যারাই জড়িত কিংবা সহায়তাকারী থাকুক না কেন সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, হামলার আগে ঘটনাস্থলে জাফর ইকবালের পেছনে হামলাকারী ছাড়া আরও দু’জন দাঁড়িয়েছিল। জাফর ইকবালের পাশে আরও দু’জন অজ্ঞাত যুবক ছিল। ছবি দেখে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের আটক করার চেষ্টা চলছে।

ফয়জুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন- ফয়জুল জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা, এ ঘটনার সঙ্গে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী জড়িত- এসব বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ফয়জুল, তার পরিবারের সদস্য এবং স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো তথ্য মেলেনি। আর সে অসুস্থ থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদও সম্ভব হয়নি।

জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা মনিটরিংয়ের সঙ্গে যুক্ত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ফয়জুলের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়। সেখানে ধর্ম নিয়ে মতবিরোধ থাকার কারণে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী তার দুই চাচা আবদুল জাহার ও আবদুল সাদিকের সঙ্গে এলাকাবাসীর সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। ফয়জুল নিজে প্রবাসী দুই চাচার প্রভাবে সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠে। মূলত সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে সে উগ্রবাদী হয়ে উঠে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। এ তথ্য যাচাই-বাছাই এবং বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মনিরুজ্জামান বলেন, জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হামলাকারী ফয়জুল ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা যেসব তথ্য দিচ্ছেন এগুলো যাচাই-বাছাই এবং বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফয়জুল অসুস্থ থাকার কারণে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে ফয়জুল স্বীকার করে, জাফর ইকবালের ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ নামক উপন্যাস লিখে নবী সোলায়মান (আ.)-কে ব্যঙ্গ করায় অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ফয়জুল দাবি করে, ‘জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু, তাই তাকে হত্যা করার জন্য হামলা করেছি। উনি নিজে নাস্তিক এবং অন্য সবাইকেও নাস্তিক বানানোর জন্য প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। তার লেখা পড়ে মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছে।’

র‌্যাব-৯ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ বলেন, মাদ্রাসায় পড়লেও ধর্ম নিয়ে তার জ্ঞান খুব বেশি না। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জঙ্গিবাদে উদ্ধুদ্ধ হতে পারে।

যেভাবে হামলা : ফয়জুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ফয়জুল স্বাভাবিকভাবেই তথ্য দিয়েছে। জাফর ইকবালকে হত্যা করতেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে দিনের পর দিন তথ্য সংগ্রহ করেছে ফয়জুল। জাফর ইকবালের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করেছে সে। এমনকি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মাঠে খেলাধুলাও করেছে সে। হামলার দিন সকালেই ক্যাম্পাসে আসে ফয়জুল। দুপুরের দিকে হঠাৎ অধ্যাপক জাফর ইকবালকে একটি অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসে থাকতে দেখে সে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা কালো টি শার্ট পরিহিত ছিল। তারা জাফর ইকবালকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। ওই সময় সে জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। জাফর ইকবালের কাছে যেতে একটি ফন্দিও আঁটে সে। সন্দেহ এড়াতে বাসা থেকে কালো টি শার্ট পরে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে ছুরি। অন্যদের মতো কালো টি শার্ট পরেই জাফর ইকবালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় ফয়জুল। জাফর ইকবালের পাশ থেকে শিক্ষার্থীরা একটু দূরে সরে গেলে হামলা চালায় সে।

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার গোলাম কিবরিয়া জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ফয়জুলকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া তার বাবা-মা এবং মামাকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ফয়জুলের শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় তাকে ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছে না। যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।-যুগান্তর।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন