মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ ০৭:৩৫:৪৭ পিএম

শ্রীদেবীর মৃত্যুর গোমর ফাঁস করে যা বললেন রাম গোপাল

বিনোদন | বুধবার, ৭ মার্চ ২০১৮ | ০৫:৪৭:৪৫ পিএম

শ্রীদেবীর মৃত্যুতে ফেসবুকে দীর্ঘ এক চিঠি লিখেছেন পরিচালক রাম গোপাল ভার্মা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘শ্রীদেবীকে প্রকাশ্যে প্রহার করতেন তার স্বামী বনি কাপুরের মা। তাকে তিরস্কার করতেন ননদ।’ চিঠিতে তিনি এমন অনেক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন। চিঠির শিরোনাম ‘মাই লাভ লেটার টু শ্রীদেবীস ফ্যানস’। দীর্ঘ চিঠিটি সরাসরি তুলে ধরেছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস। পাঠকের জন্য চিঠির অনুবাদ তুলে ধরা হলো-

নিজের সঙ্গে যুক্তিতর্কের লড়াই করলাম। লড়াই করলাম এ ভেবে, কিছু নামের উল্লেখ করা ঠিক হবে কিনা। কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে আমার মনে হলো, অন্য যে কারো চেয়ে ভক্তের কাছে শ্রীদেবী বড়। তাই তাদের সব সত্য জানা উচিত।

হ্যাঁ, আপনাদের মতো লাখ লাখ মানুষের মতো আমিও বিশ্বাস করি, তিনি (শ্রীদেবী) ছিলেন সবচেয়ে সুন্দরী। তিনি ছিলেন কমনীয়। দেশের সবচেয়ে উজ্বল সুপারস্টার তিনি। ২০ বছরের বেশি সময় তিনি প্রধান নায়িকা হিসেবে বিচরণ করেছেন। কিন্তু এসব একটি কাহিনির অংশবিশেষ।

পুরো কাহিনি অনেক কষ্টের। যা হোক, শ্রীদেবীর মৃত্যুতে আমি মর্মাহত। বেদনাহত। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যে রহস্য তা কতটা অপ্রত্যাশিত, নিষ্ঠুর ও ঠুনকো তা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল শ্রীদেবী। আমার সুযোগ হয়েছিল তার সঙ্গে দুটি ছবি করার (‘ক্ষণাক্ষণম’ ও ‘গোবিন্দা গোবিন্দা’)। ঘনিষ্ঠ হওয়ার। আমি জেনেছি, বাইরের দুনিয়ায় যেমনটা হয় তার থেকে অনেক কষ্টের একজন প্রকৃত অভিনেত্রী বা তারকার জীবন। যার একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ শ্রীদেবীর জীবন। অনেকের কাছে শ্রীদেবীর জীবন ছিল যথার্থ। তার সুন্দর মুখশ্রী, চমৎকার মানুষ, দুই মেয়েকে নিয়ে একটি স্থিতিশীল পরিবার।

বাইরে থেকে দেখে মনে হতো সব কিছুই চলছিল প্রত্যাশিতভাবে। কিন্তু শ্রীদেবী কি সুখী মানুষ ছিলেন? তিনি কি খুব সুখী জীবনযাপন করেছেন? তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমি তার জীবন সম্পর্কে জানি। তার পিতার মৃত্যুর পর আমি তাকে দেখেছি। দেখেছি আকাশে উড়ে বেড়ানো এক পাখি কীভাবে একটি খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ে।

ওই সময়ে অভিনেতাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো কালো টাকায়! আয়কর ধরা হবে এই ভয়ে শ্রীদেবীর পিতা তার বন্ধু, আত্মীয় ও সবাইকে বিশ্বাস করে তাদের কাছে টাকা রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর তারা সবাই প্রতারণা করেছে। এ অবস্থায় তার মা তাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলেন। তিনি কিছু টাকা ভুল বিনিয়োগও করেন। ফলে শ্রীদেবী পড়ে যান অথৈ সাগরে। তখনই তার জীবনে আসেন বনি কাপুর। কিন্তু তখন বনি কাপুর ছিলেন বিশাল মাপের ঋণে। তাই তিনি শ্রদেবীকে দিয়েছিলেন শুধু কান্না!

শ্রীদেবীর মায়ের ব্রেনে অপারেশন করানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। অপারেশন ভুল হয়। এতে তিনি মানসিক রোগী হয়ে যান। এমনই পথপরিক্রমায় তার (শ্রীদেবীর) ছোট বোন শ্রীলতা পালিয়ে যান। তিনি বিয়ে করেন এক প্রতিবেশীর ছেলেকে। ফলে মারা যাওয়ার আগে মা সব সম্পত্তি দিয়ে যান শ্রীদেবীর নামে। কিন্তু শ্রীদেবীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন শ্রীলতা। তিনি দাবি করেন, তার মায়ের মস্তিষ্কবিকৃতি ছিল। তিনি সজ্ঞানে উইলে স্বাক্ষর করেননি। আবার একা হয়ে পড়েন শ্রীদেবী। তার পাশে শুধু এক বনি কাপুর।

কিন্তু বনির মা শ্রীদেবীকে বাসায় কাজের মানুষ হিসেবে দেখতে থাকেন। লোকজনের সামনে তার পেটে ঘুষি মেরেছেন। এ ঘটনা ঘটেছে একটি পাঁচতারকা হোটেলে। অভিযোগ, বনি কাপুরের প্রথম স্ত্রী মোনার সঙ্গে তিনি খারাপ আচরণ করেছেন। শুধু ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ ছবির স্বল্প সময় বাদে এই পুরোটা সময় শ্রীদেবী ছিলেন চরম মাত্রায় অসুখী একজন নারী। তার সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তার ব্যক্তিগত জীবনে নানা চড়াই-উতরাই জীবনের ওপর গভীর রেখাপাত করে। এর বেশিরভাগই কষ্টের বা কুৎসিত।

তা স্পর্শকাতর মানসিকতায় দাগ কেটেছে এই সুপারস্টারের। তাই তিনি কখনো শান্তিতে ছিলেন না। শৈশব থেকেই তিনি আর্টিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। জীবনে এতসব ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গেছেন যে, জীবন তাকে কখনো স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে সুযোগ দেয়নি। বাহ্যিক শান্তির চেয়ে তার অন্তরের অবস্থা ছিল অত্যন্ত উদ্বিগ্নতায় ভরা। এটাই তাকে তার জীবন সম্পর্কে পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।

বহু মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুন্দরী। কিন্তু তিনি কি কখনো ভাবতে পেরেছেন যে, তিনি সুন্দরী ছিলেন? হ্যাঁ, তিনি ভেবেছিলেন। কিন্তু নায়িকা বা অভিনেত্রীর সবচেয়ে বড় ভয় হলো তার বয়স। তিনি এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। অনেক বছর তিনি মাঝে মাঝেই কসমেটিক সার্জারি করিয়ে যাচ্ছিলেন। তার এই সার্জারির চিহ্ন পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। সব সময় তিনি ঠিকপথে থাকতেন না।

কারণ, তিনি তার চারপাশে মনস্তাত্ত্বিক এক দেয়াল তৈরি করেছিলেন। তার ভিতরে কী চলছে কেউ জেনে যেতে পারে এটা নিয়ে তিনি সব সময় থাকতেন শঙ্কিত অবস্থায়। তার অনিরাপত্তা কিসে এটা নিয়ে কেউ যদি জানতে চাইতেন তাতেই তিনি পীড়িত বোধ করতেন। তাকে মেকআপ পরতে হতো। সেটা ক্যামেরার সামনে হোক বা না হোক। একই সঙ্গে ক্যামেরার পিছনে তার প্রকৃত জীবনের সত্য লুকানোর জন্য তাকে মানসিক এক রকম মেকআপ নিতে হতো।

তিনি অব্যাহতভাবে পরিচালিত হয়েছেন তার পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, স্বামীর নির্দেশনা মতো। কখনো কখনো তাকে চলতে হয়েছে নিজের সন্তানদের ইচ্ছায়। তিনি শঙ্কিত ছিলেন নিজের মেয়েদের নিয়ে। শঙ্কা ছিলেন যে, তার মেয়েদের মেনে নেওয়া হবে কিনা, যেমনটা হয় বেশিরভাগ তারকা দম্পতির ক্ষেত্রে। শ্রীদেবী প্রকৃতপক্ষে এমন একটি শিশু, যিনি একজন নারীর অবয়ব ধরা দেহের ভিতর বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। তিনি একজন সাদাসিধে মানুষ। তবে সন্দেহবাতিক। কারণ, তার তিক্ত অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা খুব ভালো অনুভূতির সমাবেশ নয়।

তার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহকে একপাশে রেখে আমি সাদামাটাভাবে বলতে পারি না ‘রেস্ট ইন পিস’ বা তার আত্মা শান্তি পাক, যেটা আমরা বলে থাকি মানুষ মারা গেলে। কিন্তু আমি তার ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষেই বলতে চাই, আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি তিনি মারা গেছেন। তাই তার জীবনে শেষ পর্যন্ত প্রথমবারের মতো তিনি সত্যিকারভাবে শান্তি পান।

তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ক্যামেরার সামনে তাকে আমি শুধু একবারই শান্তিতে দেখেছিলাম। সেটা হলো অ্যাকশন অ্যান্ড কাট-এর মাঝে। এর কারণ ছিল, তিনি কঠিন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। নিজের একটি ফ্যান্টাসি দুনিয়ায় বিচরণ করেছিলেন। সেজন্যই আমি এখন নিশ্চিত তার আত্মা চিরদিন শান্তি পাক, কারণ তাকে যা দেওয়া হয়েছে, যা তাকে অনেক বেদনাহত করেছে, তা থেকে তিনি এখন শেষ পর্যন্ত অনেক অনেক দূরে। শ্রীদেবী, আমি নিশ্চিত করে আপনাকে বলতে পারি, বিশ্ব আপনাকে এই শান্তিটুকু দেবে না।

আমরা ভক্তরা ও আপনার নিকটজনেরা আপনাকে শুধুই কষ্ট দিয়েছি। প্রতিটি ইস্যুতে আপনাকে আমরা কষ্ট দিয়েছি, যা আপনি পেয়ে এসেছেন সেই শৈশব থেকে। বিনিময়ে আপনি আমাদের দিয়েছেন আনন্দ আর সন্তুষ্টি। হ্যাঁ, এটা একটা ভালো বিনিময় নয়। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, আপনাকে সেই বিনিময় দেওয়ার ক্ষেত্রে।

এখন আমার দৃষ্টিতে দেখি, আপনি স্বর্গের উদ্যানে আপনার মতো করে সত্যিকার শান্তি ও সুখে একটি মুক্ত পাখির মতো উড়ছেন। আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমি এখন এটা বিশ্বাস করি। কারণ, আমরা ভক্তরা পুনর্জন্মে আরও একবার আপনাকে চাই। সেই সময়ে আমরা আমাদের সংশোধন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আপনাকে পাওয়ার জন্য আমাদের মতো করে চেষ্টা করব। আমরা সবাই সত্যিকার অর্থে আপনাকে ভালোবাসি। তাই দয়া করে আমাদের আর একটি সুযোগ দিন। আমি এভাবে লিখে যেতে পারব। কিন্তু আর আমি আমার কান্নাকে থামাতে পারছি না।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন