বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৬:৩৬:২৫ পিএম

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও নারীদের অবস্থান

খোলা কলাম | শুক্রবার, ৯ মার্চ ২০১৮ | ১১:০১:১৫ এএম

সুরমা রহমান: নারী রা তাদের সম অধিকারের জন্য লড়ে যাচ্ছে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে।মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা, মাতৃত্ব কালিন ছুটি ও তার পরবর্তিতে আবার কাজে যোগদানের ব্যাপারে কোম্পানি গুলোর অবিচার সহ সব কিছুতেই মেয়েদের সাথে ভিন্ন নীতি ব্যবহ্রত হত, এখনো হচ্ছে কোথাও কোথাও। সারাদিন রাত নারী পুরুষ সমান কাজ করে মজুরীর বেলায় নারীদের ঠকানো হত, নারীদের দেয়া হতনা উপযুক্ত কর্মঘন্টা।

পরবর্তিতে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মেয়েদের সম মজুরি, পর্যাপ্ত কর্ম ঘন্টা সহ কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। পারেনি সেদিন ও নারীরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে। তারা তাদের ন্যায্য অধিকার চাওয়ার খেশারত খুবই অমানবিক ভাবে দিতে দিয়েছিল। সেই মিছিলে চলে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর দমন-পীড়ন।

১৯০৮ সালের ৮ মার্চ আবার নিউইয়র্ক শহরের পূর্বপ্রান্তে হাজার হাজার নারী শ্রমিক শিশুশ্রম বন্ধ ও ভোটাধিকারের দাবিতে বিশাল এক প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন। ইতিহাসে যা ‘বিশ হাজারির উত্থান’ (আপরাইজিং অব টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড) নামে খ্যাত। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। মেয়েরা তখন একটা জায়গা পেয়েছিল যেখানে গিয়ে নিজের কথাগুলো ব্যক্ত করবে। সেখানে ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে নারীরা তাদের না পাওয়ার বেদনা গুলো ব্যাক্ত করেছিলেন। তারা এক হয়েছিলেন একে অপরের জন্য, সমগ্র নারী জাতির জন্য। তখন ক্লারা জেটকিন প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন।

সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে এবং এতে সায় দিয়ে দিনটি উদযাপন করতে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল নারী দিবস।

১৯৭১ সালের গৌরবময় স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশেও এ দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানের পর বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয় বেশ জাকজমক পূর্ন ভাবেই। ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের জন্য বিভিন্ন রাস্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে।

এত কিছুর পর ও কি নারীরা মুক্ত? আজ ও কি ওরা ওদের পূর্ন স্বাধীনতা নিয়ে বেঁচে আছে? নাহ। আজও বহু নারী মুখ খোলার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে কিন্তু খুলতে পারছেনা। কেন পারছেনা? কারন ওরা সেই সাহসটুকুই পাচ্ছেনা। একটা মেয়ে বাইরের মানুষ দ্বারা নির্যাতিত হয়ে যত টা না অসহায় বোধ করে, নিজেদের অনিরাপদ বোধ করে, তার চেয়ে ও বেশি বোধ করে পরিবারের নিরবতা দেখে। শুধুই নিরবতা না, পরিবারের বিচারের কাঠগড়ায় তো মেয়েটা ই থাকে প্রকৃত দোষী। ফলে ক্রিমিনাল গুলো ছাড় পেয়ে যায়। তার পর তার টার্গেট হয় অন্য কোন মেয়ে। অতচ, পরিবার, সমাজ ও রাস্ট্র থেকে সাহস পেলে, সাপোর্ট পেলে ভিক্টিমড যদি ক্রিমিনালকে বিচারের আওতায় আনত হয়ত ধীরে ধীরে সমাজ থেকে মেয়েদের প্রতি ছেলেদের অন্যায় নির্যাতন টা কমে যেত।

আমার অবাক লাগে, একটা মেয়েকে দমিয়ে দিতে যখন সমাজের সাথে সাথে তার পরিবার ও মরিয়া হয়ে ওঠে। সমাজ মনে হচ্ছে মেয়েদের বেড়ে ওঠাটাকে নিজেদের ইনসিকিউরিটির কারন মনে করে। আর তাইতো, যখন কোন মেয়ে কোন কারনে বিপদে পরে কিংবা মলেস্টেড হয় কারো দ্বারা তখন সমাজের সবার আংগুল থাকে মেয়েটার দিকে। তাকে দমিয়ে দিতে কোন প্রকারের সুযোগই তারা হাতছাড়া করেনা। ক্রমাগত তারা সাহায্য করে যায় নির্যাতিতাকে নয় নির্যাতনকারী কে। পরিবার ও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ঐ বিচারহীন সামাজকেই সায় দেয় (পরিবারের চুপ থাকাটা তাই বুঝায়)। সমাজ দমিয়ে দিতে চায় মেয়েদের যখন দেখে একটা মেয়ে আর একটা মেয়ের হয়ে কথা বলছে, একটা মেয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে আর একটা মেয়ের। একটা মেয়ে আর একটা মেয়ের পথ চলাটাকে যখন সহজ করে দিতে চাইছে হোক সে মুখে কিংবা হাতে কিংবা মাথায়, সমাজ মরিয়া হয়ে উঠবে তার মুখ কিংবা হাত ও মাথা কিভাবে থ্যাতলানো যায়। ওরা কথায় নয় ওদের অপকর্মে বিশ্বাসী।

মেয়েরা কথা বললে হয়ে যায় বেয়াদব, দুশ্চরিত্রা। তাদের প্রাপ্য অধিকারটা পেতে চাইলে হয়ে যায় লোভী। একটা মেয়ে যখন নিজের অধিকারের জন্য লড়বে তখন সে হয়ে যাবে বেহায়া। সে যখন তার অস্তিত্ব খুঁজতে যাবে, তার নিজের পরিচয় বের করতে যাবে সে হয়ে যাবে বেহায়া।

একটা মেয়ে পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাড়াতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। মেয়ে পড়া শেষ না করতেই পাড়ার কিছু সংখ্যক আন্টিদের দাঁত পরিস্কার শুরু হয়ে যায় তার বিয়ে খাবে বলে। আর পরিবারের সব সদস্যদের (সব পরিবার না) তখনকার ব্যাবহার দেখলে মনে হয় তাদের ঘরের খাবার সরবরাহ করে পাড়ার ঐ আন্টিরা যে ওদের বিমুখ করলে ঘরে খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। কেন? একটা ছেলের পড়াশুনা শেষ হওয়ার পর তো আন্টিরা দাঁত পরিস্কার করেনা! অপেক্ষা করে বিসিএস এর রেজাল্ট কবে দিবে। রেজাল্ট এর দিন এসে দরজা ভাংবে মিস্টি খাবে বলে। তবে একটা মেয়ের বেলায় এই দুই চোখ কেন? তারপর একবার কোনমতে বিয়েটা হয়ে গেলেই শুরু হয়ে যায় ঘরটা নাকি খাঁ খাঁ করে। আমি তো সেটাই বুঝিনা এত মানুষ থাকতে ঘর খা খা করতে যাবে কেন?

কারন ঐ একটা ই। মেয়েদের হাঁটু ভেংগে দেয়া। যত তারাতারি পড়াশুনা ছাড়াতে পারবে, তত তারাতারি বিয়ে, যত তারাতারি বিয়ে তত তারাতারি বাচ্চা, যত তারাতারি বাচ্চা তত তারাতারি ক্যারিয়ারের জলান্জলি। ওরা বলবে, কেন? যে মেয়েরা চাকরি করে তাদের বাচ্চা থাকেনা? উত্তর হল, থাকে। এত কিছুর পর ও হার না মানা অনেক মেয়ে আছে। অদম্য সাহস নিয়ে দাড়িয়ে থাকে মেয়েগুলো। সংসার, সন্তান, কর্মজীবন। কোনটা রেখে কোনটা? সারা দিন অফিস শেষে ঘরে এসে আবার অফিস। তখন হয়ে যায় মেয়েদের অফিসময় জীবন। তারপর ও তো বহু মেয়েকে শুনতে হয় ,"সারাদিন তুমি করটা কি?

নামক তিক্ত কথাগুলো। কারো পরিবার ভাল থাকে কারো খারাপ। কারো তো এমন অবস্থা ও হয়, তার স্বামী নামক বস্তুটি অপেক্ষায় বসে থাকে বউর বেতন হবে কবে(পরিচিত বন্ধু বান্ধবের অনেকেই এই পরিস্থিতির স্বীকার)। তারপর তো আছে বাহারী কথা নিক্ষেপ। অনেক অবলা জামাই আছে রিতীমত হাত তোলার মত জঘন্য কাজটা করতে ও ভূল করেনা। হাত তোলতে তোলতে এক সময় এটা ডেজার্ট এর মত হয়ে যায়। সময় করে তিন বেলায় ই চাই। ফলে সংসার ভাংগন। এখানে ও পরিবার সহ (সব পরিবার এক না।

অনেকে সাপোর্ট ও করে থাকেন) সবার আংগুল থাকে একেবারে মেয়েদের চোখ বরাবর। মানিয়ে নিতে পারেনি সে, আর একটা বিয়া করতে এরকম করছে, অন্য কোন ছেলেরে মনে ধরছে, বিয়ের পর জামাই সহ তার বাপ মার অন্যায় অনেক আবদার একটু আধটু মেনে নিতে হয় সহ আরো কত নিতিবাক্য যে শুনতে হয় মেয়েটার! অতচ একবার ও চিন্তা করেনা ঐ মুহূর্তে মেয়েটার ভিতরে বয়ে যাচ্ছে কি। একে তো সংসার ভাংগার বেদনা অন্যদিকে পরিবার ও সমাজ নামক উঠকো ঝামেলা। ফলশ্রুতিতে কিছু মেয়েদের আত্মহত্যা।

কিন্তু এ যায়গায়ই যদি চিন্তাভাবনাটা একটু বদলানো যেত! মেয়েগুলো পড়াশুনা করার এবং তা শেষ করে নিজের পায়ে দাড়ানোর সুযোগ পেত! তারপর নিজের মত করে সব কিছু গোছগাছ করে নিজের সাথে যায় এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করতো (বুঝাপাড়ার বিয়েতে ও যে ভাংগন ধরেনা তা না)। সব কিছুতেই মানসিক প্রস্তুতির ও ব্যাপার থাকে একটা। আমার তো মনে হয় এখনই সময় মেয়েদের তাদের নিজেদের নিয়ে ভাবার। পরিবার/সমাজ যখন সবক্ষেত্রেই মেয়েদের ই দোষ খুঁজে সুতরাং তাদের কথা চিন্তা করে নিজের স্বপ্ন/ক্যারিয়ারের জলান্জলি না দিয়ে যতদিন না নিজের একটা পরিচয় কিংবা অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় ততদিন মনে হয় নিজের লড়াটা নিজেকে লড়ে যাওয়াই ভাল অযৌক্তিক কারো পরোয়া না করে।

মহামতি লেনিন বলেছেন, ‘অত্যাচার ও অত্যাচারীদের মধ্যে, শোষক ও শোষিতের মধ্যে কখনো সাম্য হতে পারে না। যতক্ষণ না পুরুষের আইনগত সুবিধা থেকে নারী স্বাধীনতা পাচ্ছে, যতক্ষণ না পুঁজির কবল থেকে শ্রমিক স্বাধীনতা পাচ্ছে, যতক্ষণ না জমিদার বণিকের দাসত্ব থেকে কৃষক স্বাধীনতা পাচ্ছে ততক্ষণ প্রকৃত স্বাধীনতা হতে পারে না। তাই আমাদের লক্ষ্য বুর্জোয়া নারী আন্দোলন নয়, বুর্জোয়া সমাজে কিছু দাবি দাওয়া আদায় নয়, আমাদের লক্ষ্য পরিপূর্ণ নারীমুক্তি।’
সকল মেয়েদের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।
শিক্ষক ও সমাজকর্মী
লন্ডন, ইউ কে

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন