সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০১:৫৩:০১ এএম

পাহাড়ি দুই নেত্রীকে অপহরণের নেপথ্যে কারা?

জেলার খবর | মঙ্গলবার, ২০ মার্চ ২০১৮ | ০৮:৫৫:৪৫ পিএম

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা ও রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দয়া সোনা চাকমাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়েছে গত রবিবার।

তবে এখন পর্যন্ত তাদের কোনও খোঁজ নেই। কারা এই অপহরণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে সে ব্যাপারে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী, স্থানীয় লোকজন কেউই মুখ খুলছেন না ঠিকমতো। দলীয় কর্মীদের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের জেরেই বিরোধী সংগঠনের সদস্যরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

তবে কেউ কেউ বলছেন, পাহাড়ি নেত্রীদের কণ্ঠরোধ করতেই কোনও অপশক্তি এ ধরনের সন্ত্রাস ঘটিয়ে চলেছে। দুই নারী নেত্রীকে অপহরণের ঘটনায় আগামীকাল বুধবার খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফ সমর্থিত তিন পাহাড়ি সংগঠন।

সোমবার হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক দ্বিতীয়া চাকমা স্বাক্ষরিত যৌথ এক বিবৃতিতে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয় গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন। তবে পাহাড়ের অন্য সংগঠনগুলোকে এই অপহরণ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে দেখা যায়নি।

পাহাড়ে কিছু দিন পরপরই হত্যা, অপহরণ, সম্ভ্রমহানী, গুমের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সাধারণ মানুষ কেউই এর বাইরে নন। ফের দুই নেত্রীকে অপহরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

২০০৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে পৃথক একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের ১৯ বছরের মাথায় দ্বিধাবিভক্তির কারণে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টেও (ইউপিডিএফ) ভাঙন ধরে।

দল ভেঙে গত বছরের ১৭ নভেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ নামে নতুন কমিটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ নিয়ে পাহাড়ে এখন চারটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে।

গত রবিবার (১৮ মার্চ) ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুই নেত্রীকে অপহরণ করা হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, অস্ত্রের মুখে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), যা ‘মুখোশ বাহিনী’ নামেও পরিচিত, এটি তাদের কাজ।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা সভাপতি রূপসী চাকমা বলেন, ‘এটি মুখোশ বাহিনীরই কাজ। যাদের অপহরণ করা হয়েছে তাদের কোনও খোঁজ-খবরই পাওয়া যাচ্ছে না। শুনতে পাচ্ছি, মুক্তিপণ দিলে নাকি তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। আসলে তারা বেঁচে আছে কিনা আমরা এখনও তা জানি না। আমরা তাদের মুক্তির দাবিতে আগামী বুধবার (২১ মার্চ) খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছি।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, ‘বিরোধ হলেই কণ্ঠরোধ করতে হবে? এগুলো তো ঠিক না। এগুলো যারা করে তারা নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে না। তারা তাদের ক্ষমতায়নে বেশি বিশ্বাস করে।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গ্রিনহিলের সভাপতি ও উন্নয়ন সংস্থা হিমাওয়ান্তির নির্বাহী পরিচালক টুকু তালুকদার বলেন, ‘দুই পক্ষই তাদের রাজনৈতিক দলের। যাদের নেওয়া হয়েছে তারাও রাজনীতি করে, আবার যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও রাজনীতি করে। আমি যতটুকু জেনেছে, রাজনীতির কারণেই ঘটনাটি ঘটেছে। তবে যে কারণেই এটি ঘটুক না কেন তা দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘রাজনীতির মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে। তার ফলে অপহরণ করতে হবে? আমি মনে করি এটি নারীর ক্ষমতায়নে বাধা। কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের নারীনেত্রী ঝর্ণা খীসাকে রাতের আঁধারে তার বাড়িতে গিয়ে মারধর করলো। এটি উদ্বেগজনক। এ ধরনের কাজ নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অন্তরায়।’

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) মুখপাত্র তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা) তাদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি যতটুকু জেনেছি, ক্ষমতা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এ সময় জীবন বাঁচাতে তারা হয়তো কোথায় পালিয়েছে। এরপর তারা ফেসবুকে তাদের নারীনেত্রী অপহরণ হয়েছে বলে বিভ্রান্তি ছড়াতে লাগলো। আমার মনে হয় এই দুই নারীনেত্রী তাদের কাছেই আছে। তারা এটি নিয়ে রাজনীতি করে মাঠকে গরম রাখতে চায়।’

রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ সত্যজিৎ বড়ুয়া বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে অপহরণের বিষয়ে কোনও অভিযোগ করেনি। তারপরও শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় সময় লাগছে।’

প্রসঙ্গত, গত রবিবার দুপুরের দিকে ইউপিডিএফের রাঙামাটি জেলা ইউনিটের সংগঠক সচল চাকমা ও বিকেল চারটায় হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা আলাদা বিবৃতিতে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

বিবৃতিতে তারা বলেন, রবিবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকার গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের নেতা ধর্ম সিং চাকমার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় নব্য মুখোশ বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীরা গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও পিসিপি’র দুই নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে যুব ফোরামের রাঙামাটি জেলা আহ্বায়ক ধর্ম সিং চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। মুখোশ বাহিনীর সন্ত্রাসীরা এ সময় ছাত্রদের একটি মেসে আগুন ধরিয়ে দেয় বলেও অভিযোগ করেন তারা। বাংলা ট্রিবিউন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন