সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ ০৭:৫৬:৪৬ এএম

স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ: বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের অবস্থান!

সুরমা রহমান | খোলা কলাম | সোমবার, ২৬ মার্চ ২০১৮ | ১০:৫০:২২ এএম

বাংলাদেশ 'সল্পোন্নত' থেকে 'উন্নয়নশীল' দেশে পরিনত হয়েছে জেনে খুবই ভাল লেগেছে। বিদেশ বিভুইয়ে বসে এখনো কেন জানি দেশের টানটাকে কমাতে পারছিনা। কারন দেশে আত্মার আত্নীয়, আত্মার চেয়ে ও প্রিয় কিছু মানুষ এখনো রয়ে গেছেন যাদের জন্য চাইলে ও দেশকে ভূলা যাবেনা কখনো।

তাইতো প্রতিদিন ঘুম ভাংগার পর অন্য সব খবরের আগে আমি দেশের খবরটা আগে নেই। অনেক ভয় হয় এই বুঝি কোন খুন, গুম, ধর্ষন কিংবা যৌন নির্যাতনের খবর চোখে পরবে। নাহ, সেদিন ভালই খবর একটা চোখে পরল, বাংলাদেশের গায়ে 'উন্নয়নশীল' তকমা লেগেছে।

দেশ উন্নয়নশীল হওয়ার খবরটা যেমন আমাদের খুশি করেছে এর পাশাপাশি যখনই আবার গর্ভকালীন মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি জনিত কারনে শিশু মৃত্যু, শিশু নির্যাতনে শিশুদের অকাল মৃত্যু, শিশু শ্রম, নারী নির্যাতন-ধর্ষন এসবের খবর পাই মনটা আসলেই বিষিয়ে উঠে।

বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার বেড়েছে। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি লাখে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে(২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি এই জরিপ করেছে)। মাতৃমৃত্যুর সব চেয়ে বড় কারন গুলোর মাঝে একটি হল সিজারিয়ান প্রসব বৃদ্ধি। সিজারিয়ানের পর রক্তক্ষরণ ও অ্যানেসথেশিয়াজনিত জটিলতার কারণে স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে মৃত্যু হার তিন গুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে উপরোক্ত প্রতিবেদনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশের মোট সিরাজিয়ান প্রসবের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখার উচিত। তবে জরিপে গেছে, বাংলাদেশে এ হার দ্বিগুণেরও বেশি। প্রায় ৩১ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে শুনা যায় এই মৃত দেহটা কে নিয়ে ও আবার ব্যাবসা করছে হাসপাতাল কতৃপক্ষ।

শিশুশ্রম বাংলাদেশের একটা কমন চিত্র। শিশুরা হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত। প্রতিটা শিশুকে তাদের মৌলিক অধিকার গুলো দেয়া হচ্ছে আমাদের কর্তব্য। রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার দায়িত্ব শিশুদের অধিকার রক্ষা করা। দেশের কয়েক লাখ শিশু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে শিশুদের নির্যাতনের খবর আমরা পাই। কর্মক্ষেত্রে শিশুরা শিকার হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের। অনেক শিশুকে মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে ব্যবহার করছে কিছু সংখ্যক অসাধু লোক ।২০১৬ সালে সিলেট ও খুলনায় দুই শিশুকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে (প্রতিনিয়ত তা হচ্ছে। কোনটা লোকসম্মুখে আসছে, কোনটা না)। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতনের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এসব শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, কারা শিশু। এখানে বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেওয়া যাবে না। ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কাজে নেওয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেওয়া যাবে না (সুত্র- জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ, বিসিএস প্রকাশিত, ২০১৫)। কিন্তু আদৌ কি তা বাস্তবে রুপান্তরিত হচ্ছে? অসাধু ব্যাবসায়ীরা কম পারিশ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করানোর লোভে শিশুদের কাজে নিয়োগ দেয়। তাদের দিয়ে অমানবিক পরিশ্রম করিয়ে দিন শেষে নূন্যতম কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করে। আর একটু পান থেকে চুন খশলে কিংবা ঊনিশ থেকে বিশ হলে শিশুদের উপর চলে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। কেউ ওখানে থাকে দর্শক হিসাবে, কেউ বা ফটো সেশন এর জন্য, কেউ বা আবার নিরব সাক্ষী হয়ে। অসহায় শিশুটিকে বাঁচানোর মত কারো কোন ইচ্ছা থাকেনা নাকি সাহস নাই নির্যাতনকারীর উপরে কথা বলার কে জানে? এদের কেউ বিচারের আওতায় আনছেনা। আবার যাদের আনা হচ্ছে তারা কি আশানুরুপ বিচার পাচ্ছে? এদের তো এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত যেন ভবিষ্যতে কেউ দ্বিতীয়বার এমনটি করার আগে দশবার ভাবে।

নারী নির্যাতন, নারী দের উত্যক্ত করা, ধর্ষন, খুন এসব তো এখন হিসাবের বাইরে ই চলে গেছে। এটা এখন প্রতিদিনকার কমন নিউজ হয়ে গেছে তাই মনে হয় লোকজন তা গনা কিংবা এর হিসাব করা বন্ধ করে দিয়েছে। সমাজের উঁচু শ্রেনী থেকে তৃনমূল পর্যন্ত কেউ ই রেহাই পাচ্ছেনা এর থেকে। রেহাই পাচ্ছেনা রাস্তায় পরে থাকা পাগলি থেকে শুরু করে ঘরের তিন মাসের শিশুটা পর্যন্ত। বাবা, মামা, চাচা, ভাই, প্রতিবেশি সবাই ধর্ষক, সবাই উত্তক্তকারী ( সব পরিবারে না)। তাহলে মেয়ে গুলো যাবে কোথায়। মেয়েরা ঘরে বাইরে সমানে অত্যাচারিত হচ্ছে। ৭ই মার্চের কিংবা স্বাধীনতা দিবসের মত মহান দিনগুলোতে ও আমাদের মেয়েরা স্বাধীন না। মেয়েদের উপর প্রকাশ্যে এসিড নিক্ষেপ হচ্ছে, তাদের জনসম্মুখে যৌন হেনস্তা করা হচ্ছে, লোক সমাগমে গুলি করে মারা হচ্ছে, স্কুল/কলেজগামী মেয়েরা উত্তক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে। কেউ কেউ আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন কেউ বা আবার হুমকির মুখোমুখি হয়ে ঘরে বসে থাকে আর কেউবা উপযুক্ত বিচার পাবেনা ভেবে বসে থাকে চুপচাপ। অতচ ক্রিমিনাল গুলো দিব্যি মাথা উঁচু করে সবার নাকের ডগা দিয়ে হেটে বেড়াচ্ছে।

আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত, কবে এসবের অবসান ঘটবে। কবে বাংলাদেশের সর্বস্তরে উন্নয়নশীল তকমা লাগবে, কবে একটা মেয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে সমাজের প্রতিটা স্তরে। কবে একটা শিশু নিজেকে নিরাপদ মনে করবে ঘরে কিংবা বাইরে। কবে আমাদের ডাক্তারদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেয়া হবে ধৈর্যশীল হওয়ার, এ জন্য যে, সিজার নয়, নরমাল ডেলিভারীর জন্য অপেক্ষা করতে, ( প্রয়োজন হলে অবশ্যই সিজার দরকার, কিন্ত গনহারে না), নিরাপদে মা ও শিশুকে বাড়ি ফেরতে সাহায্য করতে, গর্ভবতী মা দের সাথে বন্ধুসুলভ আচরন করতে। আর সেদিন ই মনে হয় 'উন্নয়নশীল' তকমার ষোলকলা পূর্ন হবে।

সুরমা রহমান
শিক্ষক ও সমাজকর্মী (নারী ও শিশু)
লন্ডন, ইউ, কে

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন