শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ ০৩:০৯:৪৩ এএম

আওয়ামী লীগের কৌশলে বিএনপির ভেতরে সন্দেহ-অবিশ্বাস

জাতীয় | বুধবার, ২৮ মার্চ ২০১৮ | ১২:২৬:১১ এএম

দুর্নীতির দায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে আছেন গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। খালেদা জিয়ার সাজার রায় ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি ভাঙা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা।

১৬ মার্চ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের তরফ থেকে আসা বক্তব্য বিএনপির ভেতরে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি করে। বিএনপির নেতারা আওয়ামী লীগের এমন বক্তব্যকে বিএনপির মধ্যে ‘সন্দেহ-অবিশ্বাস’ ঢোকানোর অপকৌশল বলে প্রথম থেকেই উড়িয়ে দিয়েছেন।

গতকাল সোমবার ২৬ মার্চ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পর দলের মধ্যে নতুন করে ‘সন্দেহ’ তৈরি হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের কথা অনুযায়ী ‘বড়রা’ দল ছাড়লে নিচের দিকও সামাল দেওয়া কঠিন হবে?

তবে তারা এ–ও বলেন, কিছু নেতারা হয়তো দল ছাড়তে পারেন, কিন্তু ভাঙবে না। অতীতে দল ছেড়ে গিয়ে নতুন দল করে কেউই সফল হতে পারেননি। তাই দল ভেঙে আলাদা দল করার মতো অবস্থা বিএনপির কোনো নেতার এই মুহূর্তে নেই।

আওয়ামী লীগ নেতারাও বলছেন, বিএনপি ভাঙবে এমনটা বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কেউ কেউ দল পরিবর্তন করতে পারেন। আবার কেউ হয়তো নিষ্ক্রিয় হতে পারেন। নির্বাচন সামনে। দলটির কিছু নেতা হয়তো স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে পারেন বা কোনো দল থেকে প্রার্থী হতে পারেন। দল ভাঙা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্যকে দলটির নেতারাই বলছেন, এটা রাজনীতির মাঠে একটা ‘রাজনৈতিক কৌশল’। মূলত বিএনপিকে চাপে রাখার একটি চেষ্টা।

১৬ মার্চ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা এখনো সম্মতি দিচ্ছি না। সারা বাংলায় আমাদের নেতারা, জনপ্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন যে অমুক জায়গায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা যোগ দিতে চান। আজকে বিএনপির হাজার হাজার কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) কাছে থেকে আমরা গ্রিন সিগন্যাল পাইনি, সে কারণে আমরা সেই যোগদানে এখনো সম্মত হতে পারছি না। বিএনপির জোয়ারের দিন শেষ, এখন ভাটার টান।’

কাদেরের এ বক্তব্য নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘যতই এদিক-ওদিক থেকে টানাটানি করা হোক না কেন, বিএনপির সাধারণ নেতা-কর্মীরা কখনো দল ছেড়ে যায় না। বড়রা কেউ কেউ দল ছেড়ে যেতে পারে, নেতা-কর্মীরা কেউ যায় না।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক নেতা আজ সকালে বলেন, খালেদার জিয়ার কারাবাস দীর্ঘ হলে বিএনপির মধ্যে কিছু সমস্যা হবে। তবে বিএনপিকে বড় যে সংকট মোকাবিলা করতে হবে, সেটা নির্বাচনে যাওয়া না–যাওয়ার বিষয়। খালেদার অনুপস্থিতি ও বিএনপি নির্বাচন না গেলে দলের মধ্যে সংকট বাড়বে। সে ক্ষেত্রে দলত্যাগের ঘটনা ঘটবে বলে আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করছে।

দলের নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমাদের নির্দেশ দেওয়া আছে যে বিএনপি-জামায়াতের যারা সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত, এদের কাউকে দলে না ঢোকানোর জন্য। দলের সাধারণ সম্পাদক যেহেতু দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন, এটি তাদের মধ্যে কথা হয়েছে। সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারি না।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়া জেলে, তার বড় ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘পলাতক’ অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় দল পরিচালনার জন্য নেতাদের বেগ পেতে হচ্ছে। এ ছাড়া দলটির কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা থাকায় নেতা-কর্মীদের মনোবলও খুব বেশি চাঙা থাকার উপায় নেই। এ অবস্থায় বিএনপিতে ভাঙন বা অবিশ্বাস ঢুকে গেলে দলটি আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।

একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কেন, যেকোনো দলই ‘কৌশলগতভাবে’ এই সুযোগ নিতে পারে। বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হলে বিএনপি ভাঙার জন্য আওয়ামী লীগের ‘অপকৌশল’ কাজে লাগে কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে মাঠপর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মতো একটি ডুবন্ত নৌকায় মানুষ কেন যোগ দেবে? একটি দল রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ হয়ে গেছে, সেই দলে কেউ যোগ দেবে—সেটা বিএনপি তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষও চিন্তা করছে এই দল সম্পূর্ণভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের অপকৌশল চালাচ্ছে।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দী রয়েছেন। রায়ের পর থেকে নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। খালেদার জামিনের বিষয়ে আগামী ৮ মে আপিল শুনানির জন্য দিন রেখেছেন আপিল বিভাগ। ৮ মে খালেদা জিয়ার কারাবাসের তিন মাস পূর্ণ হবে। এই মামলায় খালেদা জিয়া জামিন পেলেও আরও অন্তত পাঁচটি মামলায় তাঁর জামিন না থাকায় খালেদার মুক্তি দীর্ঘায়িত হবে বলেই মনে করছেন তাঁর আইনজীবীরা।

বিএনপির নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ গত ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, নির্বাচন এখন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এ বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে সরকার জনগণকে আর হিসাবের মধ্যে রাখছে না। খালেদা জিয়া জেলে থাকায় যখন দেশের কোথাও কোনো বিএনপির নেতা-কর্মী দল ছাড়েননি, সামনের দিনেও তাঁরা দল ছাড়বেন না। এ ছাড়া নৌকা ‘নিমজ্জমান’ হওয়ায় এখন আওয়ামী লীগের নেতারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এ কারণে দলটি নানা কথা ছড়াচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি ভাঙার বিষয়টি আওয়ামী লীগের দিবাস্বপ্ন। আওয়ামী লীগের এ কথাকে কোনো রকমেই পাত্তা দিচ্ছি না। এটা তাদের দিবাস্বপ্ন। তাদের আরও অনেক দিবাস্বপ্ন ছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে দেওয়ার পর খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, দলে ভাঙন হবে, ঐক্য থাকবে না—এসব কথা তো অনেক বলেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিএনপি আগের চেয়ে এখন অনেক শক্তিশালী-ঐক্যবদ্ধ এবং খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি আগের চেয়ে বেড়েছে।’ প্রথম আলো

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন