শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:২৯:৫২ এএম

‘কেঁচি দিয়ে ডেলিভারি, প্রাণ গেল প্রসূতি ও নবজাতকের

জেলার খবর | হবিগঞ্জ | শনিবার, ৩১ মার্চ ২০১৮ | ০৮:৪৭:০০ পিএম

প্রতীকী ছবি।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজোয় নার্স-আয়ার ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যায় নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনাটি ঘটে বলে জানা যায়।

মৃত সুফলা রাণী দাশ (৩৩) উপজেলার রোকনপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা এবং নবীগঞ্জ পৌর এলাকার শিবপাশা গ্রামের মৃত সুমেশ চন্দ্র দাশের কন্যা ও উপজেলার আমড়াখাইড় গ্রামের রিপন তালুকদারের স্ত্রী। নিহত নবজাতক ছাড়াও শিক্ষিকা সুফলার ৬ বছর বয়সী অরূপ তালুকদার নামের এক পুত্র সন্তান রয়েছে।

এ ঘটনার জানাজানি হলে এ নিয়ে ক্ষোভের পাশাপাশি উপজেলা জুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

শিক্ষিকা সুফলা রাণী দাশের মা প্রণতি রাণী দাশ জানান, তার কন্যা গর্ভবতী হওয়ার পর থেকেই তারা তাদের বাসার প্রতিবেশী নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়া নমিতা রানী আচার্য'র পরামর্শ নিয়ে আসছিলেন। এমনকি ঘটনার তিন দিন পূর্বে অর্থাৎ গত রোববার বিকেলেও আয়া নমিতা রাণী পৌর এলাকার শিবপাশা গ্রামস্থ তাদের বাসায় গিয়ে সুফলা রাণী দাশকে দেখে আসেন এবং বলেন তার প্রসবের আরো তিন দিন সময় আছে। এখনো সবকিছু ঠিক আছে।

এরপর গত বুধবার বিকেল ৩ টার দিকে শিক্ষিকা সুফলার প্রসব ব্যথা শুরু হলে সুফলার পরিবার পূর্বের ন্যায় আয়া নমিতাকে খবর দেন। খবর পেয়ে নমিতা প্রসূতির বাড়িতে যান। এসময় তিনি সুফলাকে তার সাথে নিয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রসূতির সব ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডেলিভারির কার্যক্রম শুরু করেন।

এসময় প্রসূতির মা প্রণতি রাণী জানতে চান আয়া নমিতা ও সিনিয়র স্টাফ নার্স আরতি বালা নাথ দ্বারা কি তার কন্যা সুফলার ডেলিভারি সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে আয়া নমিতা রাণী প্রসূতির মাকে জানান, তারা থাকতে ডেলিভারি করতে কোন সমস্যা হবে না এবং আর কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের প্রয়োজন নেই।

প্রণতি রাণী জানান, এমন কথা বলে ওই হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স আরতি ও চন্দনা দে কে এনে তারা তিন জনের সমন্বয়ে শুরু করেন ওই প্রসূতির ডেলিভারির কাজ। এ সময় প্রসব ব্যথায় বেকুল প্রসূতির সুফলা অসহ্য হয়ে ছটফট ও হাউ মাউ করে কান্নাকাটি করলে তারা তাকে সান্ত্বনার স্থলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এমনকি প্রসূতির গলা শুকিয়ে ওষ্টগত হওয়ার ফলে তাদের কাছে পানি চাইলে তারা কোন কর্ণপাত করেননি বরং ডেলিভারির কাজ অসমাপ্ত রেখে হাসপাতালের অন্য রোগীদের পাশে গিয়ে সময় দেন।

এদিকে মেয়ের এমন অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিনি কাকুতি-মিনতি করে আয়া নমিতা ও তার সহযোগীদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে তাদেরকে ডেলিভারি কক্ষে আনেন। তাদের অনেক বুঝানোর পর তারা ওই হাসপাতালের দায়ীত্বরত চিকিৎসক চম্পক কিশোর সাহা সুমনকে প্রসূতির পাশে আনেন। তিনি এসে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর প্রসূতির অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে বলে মাকে সান্ত্বনা দেন এবং এ কথা বলে তিনি জরুরী বিভাগে চলে যান।

এরই মধ্যে প্রসূতির গর্ভের সন্তান অর্ধেক ভ‚মিষ্টের পথে। কিন্তু আয়া ও নার্সরা প্রসূতির সন্তানকে কোন ভাবে উদ্ধার করতে না পেরে ‘কেঁচি দিয়ে কেটে’ নবজাতককে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। যার ফলে প্রসূতির অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হয়। এরই মধ্যে সুফলার মৃত নবজাতক উদ্ধার করে তারা।

তার অবস্থার বেগতিক দেখে দীর্ঘ প্রায় ৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর দায়ভার এড়াতে কৌশলে তারা সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। পথিমধ্যে আউশকান্দি সংলগ্ন স্থানে পৌছলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন প্রসূতি সুফলা রাণী দাশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রসূতি সুফলার মা প্রণতি রাণী দাশ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিনিধিকে জানান, তার মেয়ের এমন রক্তক্ষরণ হয়েছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ওই সময় তার রক্তে ডেলিভারি কক্ষ প্লাবিত হয়েছে। তার মেয়ের শরীরে এতো রক্ত ছিল যা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।

এ ব্যাপারে ওই দিন জরুরী বিভাগে দায়ীত্বরত থাকা চিকিৎসক ডা. চম্পক কিশোর সাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আয়া নমিতার তত্ত্বাবধানে প্রসূতির পরিবার তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং তিনি গিয়ে দেখেছেন প্রসূতির মৃত বাচ্চা প্রসব হয়েছে। প্রসূতির অধিক রক্তক্ষরণের ফলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (ভারপ্রাপ্ত) টিএইচও ডা. আব্দুস সামাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জেনেছি ওই দিন ওই প্রসূতির মৃত বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়েছে এবং অবস্থা খারাপ দেখে তাকে সিলেট রেফার্ড করা হয়েছে এবং পথিমধ্যে তিনি মারা যায়।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন