মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ ০৯:৫৪:৩৭ এএম

ভোটের হাওয়া: মানিকগঞ্জ-২; আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব, স্বস্তি নেই বিএনপিতেও

জেলার খবর | মানিকগঞ্জ | রবিবার, ১ এপ্রিল ২০১৮ | ০৪:১৭:১০ পিএম

সিংগাইর, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-২ আসন। বর্তমানে এ আসনে সংসদ সদস্য কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম। তবে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুলের মধ্যে তার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে দু'জনেরই আলাদা বলয় তৈরি হয়েছে। কার বলয় কতটা শক্তিশালী, তার ওপর ভিত্তি করেই আগামী নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়ন নির্ধারিত হতে পারে। তবে এখানে জাতীয় পার্টির (জাপা) রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান। জোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে পারে জাপা।

এই আসনে স্বস্তি নেই বিএনপিতেও। সাবেক মন্ত্রী হারুনার রাশিদ খান মুন্নুর মেয়ে বর্তমান জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খান রিতা ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম শান্তর মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা সাপে-নেউলে। দলীয় কোনো কর্মসূচিতে তাদের একসঙ্গে দেখা যায় না।

১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপির সাবেক শিল্পমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খান নয়া মিয়া। ২০০৬ সালে তিনি মারা গেলে উপনির্বাচনে তার ছেলে বর্তমান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মাঈনুল ইসলাম খান শান্ত নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তার স্থলে মনোনয়ন দেওয়া হয় আফরোজা খান রিতাকে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন নাটকীয়ভাবে মহাজোটের প্রার্থী হন জাপার এস এম আবদুল মান্নান। ওই নির্বাচনে এস এম আবদুল মান্নান জয়ী হন। ২০১৪ সালে এই আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের মমতাজ বেগম। সে থেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট রূপ নিয়েছে, যা এখনও বিদ্যমান।

বর্তমান সংসদ সদস্য ও সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ বেগম সিংগাইর ও হরিরামপুর উপজেলায় তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কমিটিগুলোতে তার পছন্দের লোকজন বসিয়েছেন। এতে বাদ পড়েছেন অনেক পুরনো ও পরীক্ষিত নেতারা। তাদের নিয়ে দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল বড় ধরনের একটি বলয় তৈরি করেছেন। তৃণমূল পর্যায়ের বেশ কয়েকটি কমিটির নেতারাও রয়েছেন তার পক্ষে। প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে তারা শফিউল আরেফিন টুটুলের নেতৃত্বকেই পছন্দ করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিমত, এ দুই গ্রুপকে একত্র করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এর খেসারত দিতে হতে পারে।

এ দু'জন ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা পরিষদের সদস্য প্রকৌশলী আবদুস সালাম চৌধুরী ও হাটিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মনির হোসেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা উঠান বৈঠকের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তারা ব্যানার, ফ্যাস্টুন আর লিফলেটে ভোটারদের কাছে দোয়া চাচ্ছেন।

আগামী নির্বাচন নিয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ দল। দলের কাছে অনেকেই মনোনয়ন চাইতেই পারেন। তিনি মনে করেন, এই আসনে যত উন্নয়ন হয়েছে বিগত দিনে কোনো সংসদ সদস্য তা করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন, তিনি সততা নিয়ে এলাকায় কাজ করেছেন। দলের অবস্থানও আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এসব বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তাকেই মনোনয়ন দেবেন।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল বর্তমান সংসদ সদস্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেছি। ২০০৮ সালে দলের মনোনয়ন পাওয়ার পরও দলের স্বার্থে, মহাজোটের স্বার্থে জাপাকে আসনটি ছেড়ে দিই। এসব বিষয়ে দলের অবশ্যই বিবেচনায় নেবে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি আরও বলেন, তৃণমূলে জরিপ করে দলের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া উচিত। দল থেকে মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারেও তৃণমূলের চাপ রয়েছে বলে জানান তিনি।

দলীয় মনোনয়নযুদ্ধে আরেকজন শক্তিশালী প্রতিযোগী হলেন জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও জেলা পরিষদ সদস্য প্রকৌশলী আবদুস সালাম চৌধুরী। তিনি জানান, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে থেকে তিনি শিখেছেন নির্বাচনী কারিকুলাম ও জনগণের ভালোবাসা কীভাবে আদায় করতে হয়। শেখ হাসিনার উন্নয়ন রোডম্যাপে শরিক হতে দলের প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও কাজ করে যাচ্ছেন। তার দাবি- মনোনয়ন পেলে যে কোনো দলের যত শক্তিশালী প্রার্থীই হোক, তাকে পরাজিত করার সামর্থ্য রাখি।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী হাটিপাড়া ইউনিয়নের দু'বারের চেয়ারম্যান এবং মম জর্দার স্বত্বাধিকারী ধনাঢ্য গোলাম মনির হোসেন কয়েক বছর ধরে এলাকায় বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান থেকে এলাকায় তেমন উন্নয়ন করা যায় না। আগামীতে বড় পরিসরে উন্নয়নমূলক কাজ করতে চাই। এ জন্য নির্বাচন করার জন্য কয়েক বছর ধরে মাঠে নেমেছি। আশা করছি দল মনোনয়ন দেবে।

এদিকে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে জেলা বিএনপির সাধারণ সাম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম খান শান্তর কথা। তবে বসে নেই আফরোজা খান রিতাও। তিনি এলাকায় জনসংযোগসহ হাইকমান্ডেও তদবির করছেন। রিতা বলেন, তিনি প্রথমবার ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছেন। দলের মধ্যে বিরোধিতার কারণে সেই নির্বাচনে পরাজিত হন। এবার তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাপে দলের কাছে মানিকগঞ্জের তিনটি আসন থেকেই মনোনয়ন চাইবেন। সেভাবেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম শান্ত বলেন, এই আসনে তার বাবা তিনবারের এমপি ছিলেন। উপনির্বাচনে তিনিও জয়লাভ করেছেন। এবার তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারের শতভাগ আশাবাদী। প্রতিনিয়তই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সিংগাইর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবিদুর রহমান রোমান জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার আগে থেকেই তিনি মাঠে রয়েছেন। সিংগাইরের বিএনপির নেতাকর্মী সবাই তার পক্ষে।

২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে এনপি প্রার্থী আফরোজা খানম রিতাকে পরাজিত করে এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম আব্দুল মান্নান। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এবার তিনি জাপার মনোনয়ন চাইবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। আবদুল মান্নান বলেন, মহাজোটে থাকার কারণে দলের সিদ্ধান্তে গত নির্বাচনে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে তিনি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মহাজোটগতভাবে নির্বাচন হলেও এই আসনে তার মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত বলে তিনি দাবি করেন।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাপার মনোনয়নে নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া গোলাম সারোয়ার মিলনও এবারও নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং একসময়ের ছাত্রনেতা হিসেবে এলাকায় রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তবে তিনি বর্তমানে কোনো দলের সঙ্গে জড়িত নন। বড় কোনো দলের টিকিট না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানান তিনি।

-সমকাল।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন