শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৬:০১:৪৫ পিএম

কেন হঠাৎ করে মসজিদ বানাতে হচ্ছে? প্রশ্ন শাহরিয়ার কবিরের

রাজনীতি | শনিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৮ | ১১:৩১:৩৯ এএম

সারা দেশে মডেল মসজিদ বানানোর সরকারি উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক-গবেষক, তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। কাদের দাবিতে এই মসজিদ বানানো হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তিনি রেখেছেন সরকারের কাছে।

শুক্রবার (৬ এপ্রিল) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে এক সমাবেশে শাহরিয়ার কবির বলেন, কেন হঠাৎ করে মসজিদ বানাতে হচ্ছে? মডেল মসজিদ কেন বানাতে হচ্ছে? মডেল মাদ্রাসা কেন বানাতে হচ্ছে?

তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, এই দাবিটা কে করেছে? কে দাবি করেছে আমাদের মডেল মসজিদ করতে হবে? আমাদের কি মসজিদের অভাব রয়েছে? এই দাবিটা কি জামায়াত-হেফাজত করেছে? হেফাজতও তো কখনো দাবি করেনি যে আমাদের দেশে সরকারের টাকায় মসজিদ-মাদ্রাসা করতে হবে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির আরো বলেন, ইসলামের বিধান যারা জানেন, তারা জানেন সরকারিভাবে মসজিদ-মাদ্রাসা বানানো যায় না। মাদ্রাসা-মসজিদ এসব ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করবে। জনগণের পয়সায় এগুলো চলবে। দেওবন্দী মাদ্রাসা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কখনও টাকা নেয় না। তারা বলেছে এটা হারাম। তাহলে এই হারাম কাজটা কেন আমাদের সরকার করছে ?

তিনি বলেন, সরকারের টাকায় কেন দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা করতে হবে? এটা তো আমাদের সংবিধানে নাই যে সরকারের টাকায় মাদ্রাসা করতে হবে। আমাদের দেশে কি মাদ্রাসার এতই অভাব পড়েছে? অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী গত মাসে সংসদে বলেছেন, দেশে ২১ হাজার ৫০০ স্কুলে গত পাঁচ বছর ধরে হেডমাস্টার নেই। বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই, ইতিহাসের শিক্ষক নেই। বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নেই ল্যাবরেটরি। সাধারণ শিক্ষাকেও মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক করে ফেলা হচ্ছে।

শাহরিয়ার কবির বলেন, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় না। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। মাদ্রাসায় বাংলা এবং ইতিহাস পড়ানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। কেন আমাদের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানবে না ?

তিনি আরও বলেন, আমরা ৮ হাজার কওমি মাদ্রাসার উপর জরিপ করেছি, যেখানে হেফাজত শক্তিশালী। সেখানে তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না ? ৮০ ভাগ ছাত্র বলেছে, ক্লাসে শিক্ষক বলেছে, গান গাওয়া হারাম। শতকরা দুই ভাগ বলেছে, এটা হিন্দুর লেখা গান। কেউ কেউ বলেছে এটা ইন্ডিয়ান লোকের লেখা গান, সে জন্য গাওয়া হয় না। এই হচ্ছে আমাদের কওমি মাদ্রাসার চিত্র।

আগামী সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর অতীতের যে কোন সময়ের বেশি সহিংসতার আশঙ্কা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘুদের জন্য নির্বাচন উৎসবমুখর নয়, আতঙ্কের। আমাদের দেশে ২০০১ সাল, ২০০৮ সাল এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরেও সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন হয়েছে। তবে এবার আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে, সামনের নির্বাচনে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সহিংসতা হবে এবং এর প্রধান শিকার হবেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা।

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমরা ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। মায়ানমারে তাদের উপর গণহত্যা হয়েছে, এটা আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু আমাদের দেশে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে জামায়াত এবং হেফাজত মিলে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এক হাজার কওমি মাদ্রাসা তারা সেখানে তৈরি করেছে। আমরা শুনতে পাচ্ছি, জামায়াত এবং হেফাজত এক লাখ রোহিঙ্গাকে জিহাদি বানাচ্ছে। তাহলে ভবিষ্যতে এই রোহিঙ্গারা শুধু আমাদের দেশ নয়, পুরো উপমহাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাকে ৯৬ সালেও বলেছি আমাদের উপর আস্থা রাখতে হবে। জামায়াতের উপর নয়। আপনি যদি কোনদিন এই দেশকে ইসলামী রাষ্ট্র বলেও ঘোষণা দেন, তারপরও তারা আপনাকে ভোট দেবে না।

উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা উন্নত সমৃদ্ধ সৌদি আরব হতে চাই না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানবিক বাংলাদেশ চাই।

একই সমাবেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, একদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতা আরেকদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সংবিধানের এই হিপোক্রেটিক রূপ রেখে এ দেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে প্রচার করা হাস্যকর এবং প্রতারণার শামিল। আমরা এই সংবিধান মানি না। আমরা বাহাত্তরের সংবিধান পুর্নবহাল চায়। আমরা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে কখন ফিরতে পারব জানি না। তবে আমরা সংখ্যালঘুরা বঙ্গবন্ধুবিহীন এই বাংলাদেশে অস্তিত্বের সংকটে আছি।

নির্বাচনকে সামনে রেখে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করে তিনি বলেন, এই দাবি নিয়ে আমরা রাজনৈতিক দল এবং জোটের কাছে যাব। যারা এসব দাবি তাদের ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করবে না, আমরা সেই দল ও জোটকে বর্জন করব। যেসব দল সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীকে মনোনয়ন দেবে, সকল সংখ্যালঘুরা একযোগে সেই প্রার্থী এবং তার দলকে বর্জন করবেন।

সমাবেশে জনসংহতি সমিতির একাংশের সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার বলেন, শুধু মুখে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বললে হবে না। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রই যদি হবে তাহলে মন্দিরে মূর্তি ভাঙে কেন ? গ্রামে সংখ্যালঘুর বাড়িতে আগুন জ্বলে কেন? দেশে থাকলে ভোট, দেশ ছেড়ে গেলে ভিটা-এই নীতি নিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করা যায় না।

তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সংখ্যালঘুদের প্রতি আপনার আন্তরিকতা, সদিচ্ছা আছে। কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। অনেকেই আছে যাদের মধ্যে আমরা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দেখি।

সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সমন্বয়ক প্রকৌশলী পরিমল কান্তি চৌধুরীর সভাপতিত্বে নগরীর মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বাম রাজনীতিক পংকজ ভট্টাচার্য, সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি মাওলানা জিয়াউল হক, পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড.জীনবোধি ভিক্ষু ও নির্মল রোজারিও এবং কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক শ্যামল কুমার পালিত।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন