বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ১২:১২:১৩ পিএম

বাসচালকরা এত বেপরোয়া কেন?

নগর জীবন | রবিবার, ৮ এপ্রিল ২০১৮ | ০৮:৩২:৫৬ পিএম

ঢাকার নিউমার্কেট সংলগ্ন চন্দ্রিমা মার্কেটের সামনের রাস্তা দিয়ে রিকশায় করে মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন আয়েশা খাতুন। ঠিক সেসময় আজিমপুরের দিক থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দিকে যাচ্ছিল দুইটি বাস। তাদের মধ্যে কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন আয়েশা খাতুন এবং গুরুতর আহত হন। চম্পট দেয় দুই বাসের চালকই।

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আতিকুর রহমান বলেছেন, "দুই বাসের মাঝে চাপ খায় রিকশাটা। আমরা সাথে সাথে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। বাস দুইটা পালিয়ে যায়। পরে একটি বাস ড্রাইভারসহ আটক করা হয়। অন্যটির চালককে ধরা যায়নি। তথ্য-প্রমাণ আছে তারা পাল্লা-পাল্লি দিয়ে যাচ্ছিল। "

ওসি মোঃ আতিকুর রহমান জানান, এ ঘটনায় শিশুটি অক্ষত থাকলেও তার মায়ের মেরুদণ্ড মারাত্মকভাবে জখম হয় এবং অপারেশন করতে হয়েছে।

পুলিশের কর্মকর্তা আরো জানান, দুটি বাসই ছিল বিকাশ পরিবহনের।

এই ঘটনাটি ঘটলো এমন সময় যখন ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকার রাস্তায় দুই বাসের প্রতিযোগিতায় এক তরুণের হাত কাটার পর ঘটনার এক সপ্তাহও পেরোয়নি। ওই ঘটনায় বাসের যাত্রী তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হোসেন তার একটি হাত হারিয়েছেন দুই বাসের প্রতিযোগিতার মাঝে পড়ে।

কাছাকাছি সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরের এ ধরনের আরেকটি ঘটনা হতবাক করেছে অনেক মানুষকে।

ময়মনসিংহ জেলার একটি স্থানে অটোরিকশা থেকে ছিটকে পড়ার পর মধ্যবয়স্ক এক নারীকে পিষ্ট করে দেয় বাসের চাকা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেভাবেই গাড়ি চালিয়ে অনেকদূর চলে যায় বাসটির চালক। চাকার সাথে আটকে ছিল নারীর দেহ। বাসটি থামার পর চাকার তলায় পিষ্ট মায়ের লাশ বের করার অসহায় চেষ্টা-রত তার সন্তানের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

রাজ রাজধানী ঢাকায় যারা নিয়মিত সড়কে যাতায়াত করেন তাদের চোখের সামনে বাসচালকদের প্রতিযোগিতা অজানা কোনো বিষয় নয়। প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হয় না। বরং প্রতিবাদ করতে গেলে যাত্রীদের উল্টো অপমানিত হতে হয় বাসশ্রমিকদের কাছে।

এতে দেশে বাসচালকদের বেপরোয়া গতির কারণে প্রাণহানি কিংবা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু চালকদের এই বেপরোয়া মনোভাব কেন?

আন্তঃজেলা বাস চালক সমিতির একজন নেতা জাকির হোসেন বিপ্লব বলেন, মহাসড়কে ড্রাইভারদের জন্য ঘণ্টা প্রতি গতি-সীমা বেধে দিয়েছেন। কিন্তু ঢাকার রাস্তার ক্ষেত্রে চলেছে নৈরাজ্য।

"লোকাল বাসগুলো প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালায়। সেজন্য অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। চালকদের চাকরির নিশ্চয়তা নাই। তার ওপর মালিকদের দ্বারা তারা চাপে থাকে। কারণ মালিকদের ক্যাশ (নগদ টাকা) কম হলে অনেক ড্রাইভারের চাকরি চলে যায়।"

বাস মালিকদের পক্ষ থেকে অবশ্য দোষারোপ করা হচ্ছে বাসের চালক ও শ্রমিকদেরকেই।

বাস কোম্পানিগুলোর এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট খন্দকার রফিকুল হোসেন কাজল বলেন, মালিকদের পক্ষ থেকে এখন আর চাপ নেই। পাল্লা-পাল্লি করার তো আর দরকার নেই তাদের।

তিনি বলেন, বাসচালকদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত।

তার ভাষায়, "চারশো/পাঁচশো টাকা হাতে পেলেই বাসের ড্রাইভার, হেলপার যায় ইয়াবা খেতে। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা তো হবেই।"

এছাড়া ঢাকার ট্রাফিক সিস্টেমকেও দায়ী করেন তিনি। রুট পারমিট নিয়ে সমস্যাকেও তারা মনে করেন বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে পাল্লা-পাল্লির কারণ।

বাস মালিকদের কাছ থেকেই জানা গেল, বিভিন্ন ট্রিপ প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পায় একজন চালক এবং কনডাক্টর। ফলে তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি সম্ভব ট্রিপ দেয়া।

যাত্রীরাও বলছেন, কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে বাস চালায় অনেক চালক।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও বাসচালকদের প্রতিযোগিতার ফলে যে সড়কে মৃত্যু এবং জখম হওয়া থেমে নেই- তার নজির সাম্প্রতিক এসব ঘটনা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, "এর মূল কারণ হচ্ছে, বাসের চালকদের যে ধরনের প্রশিক্ষণ দরকার তা নেই । সচেতনতার মাত্রা খুবই করুণ। তার ওপর তারা মালিকদের দ্বারা এমনভাবে পরিচালিত হয় তাতে তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং তাদের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে দ্রুত বাস চালিয়ে টাকা রোজগার। সে তখন রুক্ষ ও আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।"

অনেক যাত্রীর অভিযোগ এভাবে হতাহতের ঘটনায় বাসচালকদের বড় কোনও শাস্তির নজির নেই। ফলে তাদের বেপরোয়া মনোভাবও বহাল।

তবে অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মনে করেন, শাস্তি দিলেও তাদের সুশৃঙ্খল করা যাবে না।

"কতজনকে শাস্তি দেবেন? তার আগে দেখতে হবে বাস অপারেটিং সিস্টেমের মধ্যে কারা আছেন? এখানে কোনও ধরনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নেই। গণপরিবহনকে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছাড়া যাবে না। লোকবল বাড়িয়ে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে চালাতে হবে। তাহলে যদি একটি সিস্টেম গড়ে ওঠে" বলেন ড: মোয়াজ্জেম হোসেন।-শীর্ষনিউজ।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন