বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮ ০৩:৩৭:১৫ এএম

টিউলিপ ও অশিক্ষিত খালেদা: ক্ষতিগ্রস্ত দেশ

খোলা কলাম | রবিবার, ১৫ এপ্রিল ২০১৮ | ০৩:০১:১৬ পিএম

টিউলিপ সিদ্দিক হলেন ব্রিটিশ এমপি – জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনী, তিনি দুবারের নির্বাচিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি হিসেবে বাংলাদেশের গর্ব অহংকার৷ টিউলিপের প্রতিবাদী কণ্ঠে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট গর্জে উঠে তখন একজন বাঙালী হিসেবে গর্বে অহংকারে আমাদের বুক ভরে যায় ,টিউলিপ বহির্বিশ্বে মানবতার সেবায় এক অবিস্মরণীয় নাম তিনি ব্রিটিশ বাংলাদেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যে সেতু বন্ধন করে এগিয়ে চলেছেন দুর্বার গতিতে৷

আর আরেক টিউলিপ নেদারল্যান্ডসের জাতীয় ফুলের নাম৷ এই ফুল খুবই বিখ্যাত এবং মূল্যবান এই ফুল বছরে প্রায় দু মাস পর্যন্ত থাকে মার্চ মাসের ২২ তারিখ থেকে মে মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত থাকে৷ নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টার্ডাম থেকে ৬০ কি: মিঃ দূরে অবস্থিত কেইকেনহাফ গার্ডেনে গেলে এই ফুলের বাগান দেখা যায় তাই প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন সৌন্দর্য পিপাসু হাজার হাজার দর্শনার্থী তাই নেদারল্যান্ডস সরকারের আয়ের একটা বড় অংশ আসে টিউলিপ ফুল থেকে তাই নেদারল্যান্ডসে টিউলিপ নামে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে এ জন্যে আমার মধ্যে একটা আগ্রহ ও উচ্ছাস ছিলো টিউলিপ দেখার৷ অবশেষে আজ সেই দিন আসে আমি স্ব পরিবারে টিউলিপ বাগানে যাই পরিদর্শন করি নিজের চোখে দেখি এবং বিষয়টা আপনাদের জ্ঞাতার্থে তোলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি৷
তবে টিউলিপ এই আগ্রহ ও টিউলিপ নামের সাথে পরিচিত হওয়ার কারণ ভিন্ন এখন আসি মূল আলোচনায় কেন ? টিউলিপ ব্রিটিশ এমপি – টিউলিপ ফুল – টিউলিপ কম্পিউটার৷
স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে স্ব পরিবারে হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালে এবং শেষ সময়ে ২০০১ সালে কম্পিউটার কেনার জন্য নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছিলো আওয়ামীলীগ সরকার।

২০০২ সালে খালেদা জিয়া তার শিক্ষার অভাবে মনে করেছিলো টিউলিপ শেখ রেহানার মেয়ের নাম তাই বিস্তারিত না বুঝেই চুক্তিটি বাতিল করে। এ নিয়ে টিউলিপ কম্পিউটার ক্ষতিপূরণ মামলা করে। নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডের নিম্ন থেকে উচ্চ আদালতে ছয় দফা মামলা ও আপিলে বাংলাদেশ হেরে যাওয়ার পর মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ড হয়। শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। ক্ষতিপূরণের অর্থ সরকার উদ্যোগী হয়ে পরিশোধ না করায় টিউলিপ বিদেশে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ বা উড়োজাহাজ আটকের ক্ষমতা পেয়েছে স্কটল্যান্ডের আদালত থেকে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারের দু’ বছরে এ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। আদালতের বাইরে বিষয়টি নিষ্পত্তিতে নেদারল্যান্ডসের ওই প্রতিষ্ঠানকে রাজি করাতে সমর্থ হয়েছে। আদালতের রায়ে নির্ধারিত একটা অংশ মওকুফ করতেও তারা রাজি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা- ভবিষ্যতে এই দুই দেশের সরকার বা তাদের আওতাধীন কোন প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেনে আগ্রহী করানো কঠিন হবে। ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডসের খ্যাতনামা কম্পিউটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স টিউলিপ কম্পিউটার্সের তরফে প্রস্তাব করা হয়, সে দেশের সরকারের ৫০ ভাগ অনুদানে (৪৭.৬৪ মিলিয়ন ডাচ গিল্ডার) প্রায় ১০০ কোটি টাকায় ১০৩৮৮টি কম্পিউটার ও সহায়ক সামগ্রী দেবে বাংলাদেশকে। প্রস্তাবটি ওই বছরই ২৪শে মে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। দায়িত্ব হস্তান্তরের ক’দিন আগে ৩০শে জুন সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে অনুদান চুক্তি এবং মেসার্স টিউলিপের সঙ্গে অর্থনৈতিক চুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৭৬৪ জন শিক্ষককে ১০ বছর আগেই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়ার অঙ্গীকার করেছিল টিউলিপ।

২০০১ সালের মাঝামাঝিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগের সরকারের বেশির ভাগ চুক্তি রিভিউ করে। সে সময় এ চুক্তির ব্যাপারে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সভায় আলোচনা হলেও তার অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০০২ সালের ২রা এপ্রিল বিষয়টি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হয় এবং চুক্তিটি বাতিল করা হয়। এতে সংক্ষুব্ধ মেসার্স টিউলিপ কম্পিউটার্স আলোচনা না করে চুক্তি বাতিল করা এবং চুক্তির শর্তভঙ্গের অভিযোগ এনে ডাচ আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করে। প্রতিষ্ঠানটি আদালতের শরণাপন্ন হলেও বাংলাদেশের তরফে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এক বছর পর ২০০৩ সালের ১৪ই মে ডাচ আদালত একতরফাভাবে টিউলিপের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪২,১৬,৬৪৮ ইউরো এবং মামলা পরিচালনার ব্যয় বাবদ আরও ৬,৪৬৫ ইউরো পরিশোধে বাংলাদেশকে ডিক্রি প্রদান করে। বাংলাদেশ এ রায়ের বিরুদ্ধে ডাচ আপিল আদালতে আপিল করে। এ আপিলের রায়ও বাংলাদেশের বিপক্ষে যায়। আপিল মামলার রায়ের বিরুদ্ধে ডাচ সুপ্রিম কোর্টে আবার আপিল করে তৎকালীন জোট সরকার। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আদালতের বাইরে সমঝোতা করতে বাংলাদেশের তরফে তৎপরতা শুরু হয়। কিন্তু এ আপিলের রায়ও বাংলাদেশের বিপক্ষে যায়। পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় ডাচ আদালতে আপিল মামলা দায়েরের।

২০০৯ সালের শেষ মুহূর্তে এসে সে মামলার রায় হলে তা-ও বাংলাদেশের বিপক্ষে যায়। ডাচ আইন অনুযায়ী এই রায়ই চূড়ান্ত। এ রায়ের পর আপিলের সুযোগও শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের। আপিলের সুযোগ শেষ হওয়ার পর টিউলিপ আদালতে রায়ে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ সুদসহ আদায়ে বাংলাদেশকে চাপ দেয়। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি ডাচ আদালতে তা আদায়ের জন্য আরেকটি মামলা করে। মামলায়ও বাংলাদেশ জিততে পারেনি। ২০১০ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এক পত্রে ক্ষতিপূরণ, সুদ এবং অন্যান্য খরচ বাবদ সর্বমোট প্রায় ৬১ লাখ ইউরো পরিশোধের তাগিদ দেয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, টিউলিপ কম্পিউটার্সের একের পর এক মামলা এবং বাংলাদেশের ধারাবাহিক পরাজয়, সর্বশেষ বৃহত্তর পরিসরে রায় কার্যকর করতে স্কটল্যান্ডের সেশন কোর্টে রেজিস্ট্রেশন মামলা দায়ের করলে বাংলাদেশের পতাকাবাহী কোন জাহাজ বা উড়োজাহাজ আটকের ক্ষমতা প্রায় টিউলিপ। একই সঙ্গে স্কটল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের প্রথা অনুযায়ী স্কটল্যান্ড কোর্টে মামলার ব্যয়ভার বিজিত পক্ষের বহন করার রীতি থাকায় বাংলাদেশ আইনি লড়াইয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তিতে মত দেন মহাজোট সরকারের নীতিনির্ধারকরা। সর্বোচ্চ নির্বাহীর তরফেও তাগিদ আসে। রাষ্ট্রীয় চ্যানেলে আলোচনা ব্যর্থ হয় অসম চুক্তির কারণে। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের প্রতিনিধিদের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর টিউলিপের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ আসে। সব প্রটোকল ভেঙে নেদারল্যান্ডসস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বাংলাদেশের ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল। এটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডসস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, অর্থ মন্ত্রণালয় আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার পর টিউলিপ ক্ষতিপূরণের একটি বড় অংশ মওকুফের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, এর পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমলেও ইউরোপের দেশ বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে অনেকটাই অবনতি ঘটেছে। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় বারবার আদালতে হেরে যাওয়ায় দেশের ইমেজ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিদেশের আদালতে মামলা পরিচালনার বিশাল ব্যয়, সর্বোপরি ২০০১ সালে ৩৩৮২টি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার শিক্ষা এবং প্রায় ৭০০০ শিক্ষকের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ থেকে দেশ বঞ্চিত হয়েছে অশিক্ষিত খালেদা জিয়ার বদৌলতে।

লেখক: আব্দুর রহিম শামীম

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন