বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ ০১:২৭:৩৮ এএম

রানা প্লাজা: মাঝে মাঝে মনে হয় কেন বেঁচে গেলাম!

রবিন আকরাম | জাতীয় | রবিবার, ১৫ এপ্রিল ২০১৮ | ০৪:৩২:৫৪ পিএম

মেশিনের নীচে চাপা পরে চারদিন আটকে থেকে মৃত্যুর গন্ধ নিতে নিতেই তিনি আরেকবার বাঁচার আশা করছিলেন মায়ের মুখটি অন্তত একবার দেখার জন্য। কিন্তু মরণ থেকে ফিরে আসার পাঁচ বছর পর যখন সংসার টানতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে তখন তার প্রায়ই মনে হয় কীভাবে আর কেনই বা তিনি শিল্পক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহতম ঐ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরলেন!

কথাগুলো বলছিলেন ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় আহত হওয়া ৩৫ বছর বয়সি শ্রমিক রুবিনা। ভবনটি যখন ধসে পড়ে তখন সেখান থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার পাওয়া প্রায় দু’হাজার শ্রমিকের মধ্যে তিনি একজন। রুবিনা ওই ভবনের সাত তলায় থাকা একটি গার্মেন্ট এর পকেট সেলাইয়ের কাজ করতেন।

সেই ঘটনার ৫ বছর পর রুবিনা জানালেন তার করুণ কাহিনি। বললেন, উপার্জন করে ন’বছর ধরে আমিই আমার পরিবারে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু এখন আমার হাতে নিয়মিত কাজ নেই। রানা প্লাজার ঘটনার পর যা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলাম তার প্রায় বেশিরভাগই আমার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে৷ দুর্ঘটনার পর আগের মতো কাজ করতে পারি না। তাই আর আয় নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে মনে হয় কেন বেঁচে গেলাম!

শুধু রুবিনা নয়, এই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আহত অনেক শ্রমিকই আগের চেয়েও দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসার পেছনে পাওয়া ক্ষতিপূরণের সমস্ত টাকাই খরচ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর অনেকেই শারীরিক ও মানসিক কারণে কাজে ফিরে যেতে পারেন নি।

এই ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলো একসাথে ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মস্থল, চার হাজারেরও বেশি কারখানার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাপ তৈরি করে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বাজার ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার৷ অথচ এ শিল্পটির শ্রমিকরা বড় বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েও অরক্ষিতই রয়ে গেল।

শ্রম-অধিকার কর্মীরা বলছেন, রানা প্লাজা ধসের পর সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া অনেক শ্রমিকই অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরেন। আবার অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরায় কাজে ফিরে যেতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। এদের কেউ কেউ কাজের ব্যাপারে পুরোপুরি তৈরিও হতে পারেননি আজ পর্যন্ত।

ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন এর সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, আহত শ্রমিকরা মানসিক ও শারিরীক সংকট নিয়েই বেঁচে আছে। বেশিরভাগই শারীরিক ক্ষত নিয়েই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছেন। কেননা তাঁদের জন্য পুরো সময় কাজ করা কঠিন। তাঁরা যে অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছিল, তা অতিদ্রুত শেষ হয়ে গেছে।

যেখানে রানা প্লাজা ধসেছিল সেই জায়গায় এখন ঘাস জন্মেছে। রয়েছে আবর্জনার স্তূপ। প্রতিবছর ২৪ এপ্রিল সেখানেই ফুল দিয়ে নিহতদের স্মরণ করা হয়। সেখানে থাকা ধুলায় ধুসরিত হয়ে যাওয়া এপিটাফে লেখা – ‘অশ্রুসিক্ত নয়নে আমরা তোমাদের স্মরণ করছি এবং আমরা কখনো ভুলবো না। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি, বললেন রানা প্লাজার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া লুৎফা বেগম।

তিনি বলেন, গত কয়েকবছর ধরে কেউ আমাদের খোঁজও নেননি। আমি যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলাম তা মেয়ের বিয়ে, দু’টি গরু কিনে এবং চিকিৎসার পেছনে অনেক আগেই খরচ হয়ে গেছে। এখন আমি মিষ্টি বানাই আর বিক্রি করি।

৪০ বছর বয়সি লুৎফা বেগম রানা প্লাজার আট তলায় পায়জামা সেলানোর কাজ করতেন। তিনি স্পষ্ট মনে করতে পারেন দুর্ঘটনার সময়টি।

তিনি বলেন, আগের দিন ভবনে বড় ফাটল থাকায় আমাদের ভবনটি খালি করতে বলা হয়েছিল। ভবন ধসের দিন আমরা শক্তভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম মাত্র৷ কারণ আমরা জানতাম আমাদের সামনে কোনো ভবিষ্যত নেই। আমার স্বপ্ন ছিল আমি গ্রামে গিয়ে একটি দোকান খুলবো৷ শেষ কয়েক বছরে সেই বিশ্বাস ক্রমাগত ভেঙে গিয়েছে।

রানা প্লাজার আহতরা দুঃসহ সেই স্মৃতি নিয়েই জীবনযুদ্ধে ফের নেমেছেন। নতুন জীবন যেন তাদের পুরনো জীবনের চেয়ে আরও কঠিন, স্বপ্নহীন!

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভার বাসস্ট্যন্ড সংলগ্ন আট তলা রানা প্লাজা ভেঙে পড়লে শিল্পক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত হন এক হাজার ১৩৫ জন, আহত হন আরও হাজারখানেক শ্রমিক যারা ওই ভবনের পাঁচটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ডয়চে ভেলে

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন