বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০২:১৫:৪০ এএম

এমন মৃত্যু ঠেকানোর দায়িত্ব আমার-আপনার

জাতীয় | মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল ২০১৮ | ০৬:০৬:০৭ পিএম

রাজীব নেই। আমরা খুব কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু রাজীবের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ত্রুটির কারণে এমন মৃত্যু, সেই ত্রুটিগুলো সারানো দরকার। মন মৃত্যু ঠেকানো সবার দায়িত্ব আমার, আপনার, সমাজের রাষ্ট্রের।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের প্রধান ও রাজীবের চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান মো. শামসুজ্জামান মঙ্গলবার (১৭ এপ্রিল) সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন। এই কয়েক দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজীবের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন তিনি।

রাজীবের এমন মৃত্যুর জন্য সড়ক দুর্ঘটনাকে দোষারোপ করে তা প্রতিরোধে প্রত্যেককে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা একটু লেখালেখি করেন। এমন মৃত্যু ঠেকানো সবার দায়িত্ব—আমার, আপনার, সমাজের রাষ্ট্রের। এই যে রাজীব, খুবই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা–মা নেই। সংগ্রাম করে জীবন চালাচ্ছিল। ছোট ছোট দুটি ভাই।’

রাজীবকে হাসপাতালে আনার পর থেকে চিকিৎসকদের তৎপরতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যেদিন প্রথম আলোয় ওর (রাজীব) ছবি ছাপা হলো, সেদিন সকালেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই, যেভাবে হোক ওকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসতে হবে। ততক্ষণে ওর অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে। আমরা বললাম, আউটডোর দিয়ে আসতে সময় লাগবে, জরুরি বিভাগ দিয়ে দ্রুত ভর্তি করার ব্যবস্থা করলাম। বোর্ড হলো। দেখলাম, অস্ত্রোপচারটা ভালো হয়েছে। শমরিতায় যে করেছে ও আমাদেরই সহকারী অধ্যাপক। দেখলাম, ওর মাথার সামনের দিকে আঘাত আছে। সাতজনের বোর্ডে দুজন নিউরোসার্জন ছিলেন। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা করলাম। সিটি স্ক্যান রিপোর্ট ভালো। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি।’

শুরুতে রাজীবের প্রাণহানির আশঙ্কা ততটা ছিল না উল্লেখ করে অধ্যাপক মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘রাজীব সে সময় স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। আমরা চিকিৎসায় সারিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। সবই ঠিকঠাক। গত সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত সব ঠিক। রোগী ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠছে। সেদিন বিকেলে করা সিটি স্ক্যান রিপোর্ট তা–ই বলে। হঠাৎ মঙ্গলবার ভোর চারটায় ওর শ্বাসকষ্ট হতে শুরু করল। কোনো কারণে গলায় কিছু বেঁধে গেল কি না, তা–ও দেখা হলো। পরে নেবুলাইজেশন দেওয়া হলো। রাজীব স্বাভাবিকভাবে শ্বাস–প্রশ্বাস নিচ্ছিল। এরপর আবারও খারাপ হতে শুরু করল। আমরা ওকে ভেন্টিলেশনে দিলাম। আমরা ওর ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি। দ্রুত সিটি স্ক্যান করা হলো। কী বলব! আগের দিনের রিপোর্টের ঠিক উল্টো। একদম খারাপ।’

তিনি বলেন, ‘ওর (রাজীব) মস্তিষ্ক এত ভালো কাজ করছিল যে আমরা অপারেশনে যাইনি। আর যখন খারাপ হলো, এত খারাপ হলো যে অপারেশনের আর সুযোগ পাওয়া গেল না। মস্তিষ্কের যে অংশটি অক্সিজেন সরবরাহের কাজ করে, সেটা চাপ খেয়ে গিয়েছিল। মাথার সামনের দিকের আঘাতের জন্য ওই অংশটি ফুলে উঠেছিল। মাথার মাঝখানটা কাজ করতে পারছিল না। বিএসএমএমইউয়ের ভিসি কনককান্তি স্যার নিজে এলেন। দেখে বললেন, এখন অস্ত্রোপচারে আর কাজ হবে না। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।’

এরপরও আশা ছেড়ে দেননি জানিয়ে অধ্যাপক শামসুজ্জামান বলেন, ‘তারপরও আমি আশা করেছিলাম। অল্প বয়স, হয়তো ফিরবে। আমরা ওর কিডনি, ফুসফুস, হৃদযন্ত্রটা যেন ঠিকভাবে কাজ করে সেদিকে নজর দিচ্ছিলাম। ঠিকঠাক কাজ করছিলও। বৃহস্পতিবার কিডনিটা ঠিকমতো কাজ করছিল না। পরে সেটাও ঠিক হলো। গত পরশু দেখলাম, জ্বর। ফুসফুসে প্রদাহ থেকে জ্বরটা এসেছিল। এই লক্ষণ খুব খারাপ।’

তিনি বলেন, ‘শেষ সময়ে সাপোর্ট দেওয়ার পরও ফুসফুস কাজ করছিল না। ফুসফুস রক্তে অক্সিজেন নিতে না পারলে হৃদ্‌যন্ত্র কাজ করে না। একসময় হৃদ্‌যন্ত্রটা বিকল হয়ে গেল। মারা গেল রাজীব। ওর মস্তিষ্কটা যদি ধীরে ধীরে অসাড় হতে থাকত, তবু চেষ্টা করা যেত। হরদম ঢাকা মেডিকেলে এমন অস্ত্রোপচার হচ্ছে। এক ঘণ্টা লাগে এমন অস্ত্রোপচারে। সব প্রস্তুতি ছিল, রাজীব সুযোগটাই দিল না।’

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন