রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ০৯:১৪:৩২ এএম

৩ দিন পেরিয়ে গেলেও গ্রেফতার হয়নি, আরেক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চায় রনি

খেলাধুলা | রবিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৮ | ০৪:২৪:১১ পিএম

চাঁদার দাবিতে মারধর ও প্রাণণাশের হুমকি দেয়ার ঘটনায় মামলার ৩ দিন পেরিয়ে গেলেও গ্রেফতার হয়নি নুরুল আজিম রনি। পুলিশ বলছে- তাকে পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া মাত্রই গ্রেফতার করা হবে। পুলিশ তাকে না পেলেও ফেসবুকে বেশ সরব চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া এ নেতা। অভিযোগ থেকে রেহাই ও মানুষের সহানুভূতি পেতে ফেসবুককে ব্যবহার করছে সে। শুক্রবার এক স্ট্যাটাসে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ‘মাফিয়া’ আখ্যা দিয়েছে রনি।

এরই মধ্যে এবার একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে এক ব্রোকারি ব্যবসায়ীর কাছে করা ওই ফোন রেকর্ড শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এতে রনির কণ্ঠ নিশ্চিত হওয়া গেলেও ওই ব্যবসায়ী কে তা শনিবার পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি।

ওই কথোপকথনে রনি এক প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে, ‘কী হবর বদ্দা। রনি হইদ্দি (কী খবর বড় ভাই। রনি বলছি)’। অপর প্রান্তের ব্যক্তি সালাম দিয়ে রনির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। তবে তাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রনি বলে, ‘তোর তুন ১০ লাখ টেঁয়া আঁই লইয়ুম। টেয়া পাইদ্দে আঁই (তোর কাছে ১০ লাখ টাকা আমি নেব। আমি টাকা পাব)।’ বিপরীত প্রান্ত থেকে কিছু বললে উত্তেজিত হয় রনি। উচ্চস্বরে বলে, ‘অনর বদ্দিন্যা চ’র নে আঁই (আপনার বাপের চাকর নাকি আমি)।’ একাধিকবার একথা বলা পর রনি বলে, ‘অন’র ব্রোকারিসহ আঁই বাইর গইরগুম (আপনার ব্রোকারি আমি বের করব)।’

কোচিং সেন্টারের যে মালিককে ৬ মিনিটে ১৩টি চড় মেরেছে, ১০ বার চুলের মুঠি ধরে টেনেছে, চেয়ারে শুইয়ে গলা টিপে ধরেছে- সেই রাশেদ মিয়াকে রনি এবার ফেসবুকে সম্বোধন করেছে ‘ভাই’ বলে। ঈদে বাবা-মাকে টাকা বা কাপড়-চোপড় দিতে না পারা, সংগঠন থেকে বিদায় নেয়ার সময় মাত্র ৭২ টাকার মালিক ছিল বলে ফেসবুকে লিখেছে সে। তবে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরাই বলছেন- এগুলো মায়াকান্না, লোক দেখানো।

একদিন আগেই স্ট্যাটাসে সে দাবি করেছিল ব্যবসায়ী রাশেদকে দুই চেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে! আর ‘কোচিংবিরোধী আন্দোলনের নেতা’ নিজেই কোচিংয়ে জড়িত থাকার কথা বলে উসকে দিয়েছে প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন জানান, যারা তাকে (রনি) বুঝে-না বুঝে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন, তার কর্মকাণ্ডে সমর্থন জোগাতেন, একের পর এক ফুটেজ ও অডিও ফাঁস হওয়ার পর তাদের ভুল ভেঙেছে।

একাধিক নেতাকর্মী বলেন, ‘রনি অত্যন্ত উগ্র, দাম্ভিক ও বদমেজাজি ছিল। নগর আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাদের কারও নিয়ন্ত্রণ ছিল না তার ওপর। সে কারও কথা শুনত না। তবু কেউ কেউ তাকে ব্যবহারের স্বার্থে সমর্থন জুগিয়েছিলেন।’ শুক্রবার ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে রনি লেখে, ‘অনেক কলঙ্ক শরীরে লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতারা। ... নিজের পরিবারের আয়ের উৎসের মূলধন ভেঙে রাশেদ ভাইয়ের সঙ্গে ভার্সিটি ভর্তি কোচিংয়ে যুক্ত হয়েছিলাম। আমার অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে জেনেও ২০ লাখ টাকা উল্টো চাঁদাবাজি মামলা করালেন।’ একই স্ট্যাটাসে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে রনি লেখে- ‘নিু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা সৎ উপায়ে কত কষ্ট করে সংগঠন করে তা মাফিয়া নেতারা বোঝে না। কারণ আমরা তাদের সন্তানদের মতো কোটি টাকার গাড়ি বিলাস করার সুযোগ পাইনি।’

ফেসবুকে আরেক স্ট্যাটাসে রনি লিখেছে- “রনি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কেউ রাজনীতি করো না। সর্বোচ্চ ‘রনি’ চরিত্রটি যে কোনো গল্প, কবিতা বা উপন্যাসে ঠাঁই দিতে পারো। কারণ বাস্তবতা অনেক কঠিন।” সে আরও লিখেছে- ‘রনি’দের স্বপ্ন পূরণ হবে না এ সমাজে। যে কলেজেগুলোতে প্রগতির পতাকা উত্তোলনের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে কলেজগুলোর জন্য পাবলিক দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। দায়ী কে? রনি নাকি রনি বিরোধীরা?

শিক্ষা আন্দোলনের পতাকা উড়িয়ে রনিরা পেয়েছে চাঁদাবাজির খেতাব। অথচ শিক্ষা বাণিজ্যে নিয়োজিতরা দাঁত কেলিয়ে হাসছে এই নগরের লুট ভবনগুলোতে। মাঠ রক্ষার আন্দোলনে গিয়ে রনিরা হয়েছে বুলেটবিদ্ধ, হয়েছে বাঁশ রড চুরি মামলার আসামি। আর মাঠখেকোর নাম হয়েছে বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ডট ডট ডট গোস্বামী চন্দ্রবিন্দু। মানবতার উদাহরণ তৈরি করতে গিয়ে রনিরা হয়েছে প্রতারকের হাতে পরাজিত, এতেও সার্বিক সহযোগিতায় একই মোস্তাক চক্রবর্তীরা।’

২০১৪ সালের ১৩ জুন ইমরান আহমেদ ইমুকে সভাপতি ও নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সংসদ। পদ পাওয়ার পর থেকেই নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে রনি। শিক্ষা আন্দোলনের নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে হম্বিতম্বি করে। হাটহাজারীতে ভোট কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে অস্ত্রসহ ধরা পড়ে। ২ বছর সাজা হয় তার। মুরাদপুরে একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানাও দখল করে রনি।

চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহেদ খানকে তার অফিস কক্ষেই মারধরের ভিডিও ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পর তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ জিইসি মোড়ের ইউনিএইড কোচিং সেন্টার মালিককে তার অফিসে ৬ মিনিট নিষ্ঠুরভাবে চড়-থাপ্পড় মারার ভিডিও ফুটেজ ফাঁস হয়।

২০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে তাকে এমন মারধর করা হয়েছে অভিযোগ এনে আক্রান্ত রাশেদ বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। রাতেই রনিকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দেয় ছাত্রলীগ।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন