শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৪:৪২:১৪ পিএম

আইন অমান্য করে ভরাট করা হচ্ছে পুকুর ও জলাশয়

রোকনুজ্জামান | জেলার খবর | কুষ্টিয়া | মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ | ১১:১৪:১০ পিএম

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জগতি খাদ্য গুদামের অভ্যন্তরে বহু বছরের পুরাতন একটি পুকুর ছিল। পুকুরটিতে মাছ চাষসহ আনুসাঙ্গিক কাজ সারতেন এখানকার বাসিন্দারা। পুকুরের গা লাগোয়া পরিত্যক্ত একটি গোডাউন রয়েছে। সম্প্রতি নতুন একটি গোডাউন নির্মাণ করতে পুকুরটিকে হত্যা করা হয়েছে।

অথচ পুরাতন গোডাউনটি অপসারন করে অনায়াসে সেখানে নতুন একটি গোডাউন নির্মাণ করা যেত। গোডাউনের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের আপত্তি সত্বেও উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারনে পুকুরটি বাঁচানো যায়নি। এখানে গোডাউন নির্মাণ করা হলে বর্ষা মৌসুমে পুরো গোডাউন হাটু পানিতে ডুবে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সবাই। কুষ্টিয়ায় সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের মত পুকুর ও জলাশয় ভরাটে কোন আইন মানা হচ্ছে না। একের পর এক পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন ও বিপনী বিতান।

আর এতে করে পরিবেশে নানা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে পৌর এলাকার প্রায় ১০ হাজার নলকুপ অকেজো হয়ে পড়েছে। পানির স্তুর গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এখন শহরে আগুন লাগলেও পানি খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভীর রহমান জানান,‘ পুকুরটি ভরাট করে ফেলায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়েছে। পুকুরটি রক্ষা করে পুরাতন গোডাউন ভেঙ্গে নতুন করে করলে ভাল হত। বিষয়টি মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়েছে। এছাড়া আমার যোগদানের আগে প্রক্রিয়াটি শেষ করা হয়েছে। পুকুর ভরাট করে ফেলায় নতুন করে অনেক সমস্যা ফেস করতে হবে।’ পৌরসভা থেকে জেলা প্রশাসনকে একের পর চিঠি দিয়ে পুকুর ভরাটকারিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানালেও তা কার্যকর হচ্ছে না। বরং প্রভাবশালী মহল আইনের তোয়াক্কা না করে সবাইকে ম্যানেজ করে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সরেজমিন শহরের চৌড়হাস এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সেখানে এক সাথে বড় বড় ২টি পুকুর ভরাট করা হচ্ছে।

প্রকাশ্যে চলছে ভরাটের কাজ। পুকুর মালিক সেখানে বহুতল ভবন করা জন্য পুকুর ২টি ভরাট করে ফেলছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা কাউসার হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, তারা ৪/৫ জন মিলে এখানে মাছ চাষ করতেন। পুকুর ভরাট করে ফেলায় তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। মালিককে তারা বোঝালেও তাদের কথা শোনেননি। পুকুরগুলো থাকায় এলাকার পরিবেশ ঠান্ডা থাকত। মানুষজন গোসল ও অন্যান্য কাজ করতে পারত। বৃষ্টি হলেও কোন জলাবদ্ধতা ছিল না।

এখন এলাকা খাঁ খাঁ করছে। একই এলাকায় আরো কয়েকটি পুকুর ভরাট করে বাড়ি-ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া চৌড়হাস ফুলতলা এলাকায় বিশাল একটি দীঘি ছিল। যার আয়তন কয়েক একর। কয়েক বছর আগে এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী সেটির অর্ধেক অংশ বন্ধ করে প¬ট করে বিক্রি করে দিয়েছেন। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে,‘ পৌরসভার আয়তন আগের থেকে বেড়েছে। এখন আয়তন প্রায় ৪৬ বর্গকিলোমিটার। কিছুদিন আগেও পৌর এলাকায় শতাধিক বড় বড় পুকুর ও জলাশয় ছিল। এখন খুঁজলে কয়েকটির অস্তিত্ব পাওয়া যাবে মাত্র। আর সব পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন ও মার্কেট করা হয়েছে। শহরের পুলিশ লাইনের সামনেই একাধিক বড় বড় পুকুর ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে ৫ থেকে ৬টি বহুতল ভবন।

কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান,‘ পৌর এলাকায় একের পর জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ পুকুর ভরাট আইনে স্পষ্ট বলা আছে শহর এলাকায় কোন জলাশয় ভরাট করা যাবে না। কেউ যদি পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তারা জেলা প্রশাসনকে বারবার চিঠি দিয়ে চৌড়হাসসহ কয়েকটি এলাকার জলাশয় ভরাটের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তারপরও প্রভাবশালীরা দমছে না। পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ বছর প্রায় ১০ হাজার নলকুপ অকেজো হয়ে পড়েছে। পানির স্তর প্রায় ২৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। বিদ্যুৎ যদি কোন কারনে কয়েকদিন না থাকে পানির জন্য হাহাকার তৈরি হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক পুকুরকে হত্যা করা হয়েছে।’ পুকুর ও জলাশয় ভরাটের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরসহ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয়। তবে গত ৫ বছরে এ জন্য কেউ আবেদন করেননি।

শুধু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে পুকুর ও জলাশয় ভরাটের নিয়ম রয়েছে। তাও পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলে তখন এ বিষয়ে কাজ করা যাবে। কুষ্টিয়া পৌর এলাকার পুর্ব মজমপুর এলাকার বাসিন্দা সমাজকর্মি মিজানুর রহমান লাকী বলেন,‘ চলতি বছর টিউবয়েল ও মটর দিয়ে পানি তোলা যাচ্ছে না। দিনের বেলা পানি তুলতে কষ্ট হয়। আশেপাশের সব পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র রসায়নবিদ মিজানুর রহমান জানান,‘ আইন অনুযায়ী পুকুর ভরাট করা কোন সুযোগ নেই। তবে সবার অগোচরে প্রভাবশালী লোকজন রাতারাতি পুকুর ভরাট করে ফেলছে। অভিযোগ না পেলেতো আর আমরা কোন ব্যবস্থা নিতে পারি না। কয়েক বছর আগে পুকুর ভরাটের জন্য একটি আবেদন পেয়েছিলাম, নতুন করে কেউ আবেদন করেনি।’

কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আলী সাজ্জাদ বলেন,‘ পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়তে হয় তাদের। অনেক এলাকায় আগুন লাগলে পানি পাওয়া যায় না। তাই পুকুরকে বাঁচিয়ে রাখলে সবার লাভ।’ সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পুকুর বাঁচাতে পৌরসভা, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। এখনও সময় আছে। এখনই যদি শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া যায় তাহলে শহরে মানুষ বাস করতে পারবে না।

কারণ শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। ভরাটকারিরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে সাধারন মানুষকে সাথে নিয়ে মাঠে নামতে হবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. রেজাওয়ানুল ইসলাম বলেন,‘ শহরে যেভাবে পুকুর হত্যা করা হচ্ছে তাতে পুরো পরিবেশে বিপর্যয় ডেকে আনবে।

আইন কাগজে-কলমে থাকলে তো লাভ হবে না, এর প্রয়োগ হতে হবে। কারণ পুকুর ও জলাশয় একটি এলাকার হার্ট। তাই হৃদযন্ত্র যদি খারাপ হয়ে যায় তাহলে কোন কিছুই বাঁচবে না। তাই সবাইকে এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হান বলেন, ‘বেশ কয়েকটি মৌখিক অভিযোগ পেয়েছেন। পুকুর ও জলাশয় ভরাট রোধ করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হবে। যাতে পরিবেশ রক্ষায় পুকুর বাঁচানো যায়।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন