বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ ০১:১৪:৩০ এএম

বৃদ্ধাশ্রম কি পারস্পরিক অবহেলার ফসল ?

খোলা কলাম | বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ | ০৬:২৫:৪৫ পিএম

টর্ট আইনে “পারস্পরিক অবহেলা “ পড়ছিলাম ।যেখানে বাদী বা বিবাদী সমানভাবে তার কাজের অবহেলার জন্য দায়ী থাকেন । আচ্ছা বৃদ্ধাশ্রম কি পারস্পরিক অবহেলার ফসল?

আজকে আমি সন্তান লালন পালনের সময় তাকে প্রতিনিয়ত বলছি বড় হয়ে ডাক্তার হও, ইন্জিনিয়ার হও ।তোমাকে ক্লাসে প্রথম হতে হবে ।শোন তুমি কিন্ত ক্লাসে গিয়ে প্রথম বেঞ্চটিতে বসবে ।কিংবা সন্তান এসে যদি বলে মা আমার বন্ধু কয়দিন ক্লাসে আসতে পারেনি ওকে আমার খাতাটা কিছুদিনের জন্য দিতে হবে ।আমরা না করে দি ।পাছে ভাবি আমার সন্তান পিছিয়ে পড়বে ।কিন্ত হায় এ না বলাতে কোথায় পিছিয়ে গেলো আমার সন্তান ভাবছি কি?চরম আত্নকেন্দ্রিক করে ফেলছি সন্তানকে ।ভাবাতে শেখাচ্ছি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবো ।

বৃদ্ধাশ্রমগুলিতে অনেক বাবা –মা আছেন ।যারা অবসরপ্রাপ্ত সচিব,প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী,শিক্ষকসহ আরও অনেক ধরনের পেশায় নিযুক্ত ছিলেন । সন্তানের ভালোর জন্য তাদের উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন । বিদেশ গিয়ে সন্তান প্রবাস জীবন বেঁছে নিয়েছে,কেউ বড় চাকুরে হয়ে দেখভালের সময় বের করতে পারে না ।তারা তাদের নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ।বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাভাল করার সময় কই!চরম ভোগবাদী মানিসক অভ্যস্ত জীবনে বৃদ্ধাশ্রম প্রাদান্য পাচ্ছে দিনে দিনে ।সমাজবিজ্ঞানও নৈতিক শিক্ষা এবিষয়টিকে প্রশ্রয় দেয় না ।

সামাজিক বলয়ের বাইরে যেকোন কিছুই সমাজবিজ্ঞানে সমালোচিত ।বৃদ্ধ পিতা মাতা বৃদ্ধ বয়সে অতিরিক্ত সেবা পাবার কথা ।শেকসপিয়ার বৃদ্ধকালীন সময়কে ২য় শৈশবের সাথে তুলনা করেছেন ।আর বৃদ্ধাশ্রমে অমানবিক পরিবেশে রাখা নৈতিক শিক্ষারও বাইরে ।প্রবীণরা স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সাথেই থাকতে চান এবং সামাজিকভাবেও সেটাই হয়ে আসছে।তবে সময়ের সাথে সাথে সামাজিক অবস্থা এবং পারিবারিক কাঠামোতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে প্রবীণদের জন্য যথেষ্ট সেবা-ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে আসছে এবং মানুষজন গ্রাম ছেড়ে শহরে বা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে অনেক মা-বাবাই অরক্ষিত হয়ে পড়ছেন।

মা-বাবার সুরক্ষার জন্য ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ পাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার ।এ অনুযায়ী মা-বাবারা সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ লাভের আইনি অধিকার আছে, যা ক্ষুণ্ন হলে যেকোনো মা-বাবা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। আইনে ভরণপোষণ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গপ্রদানকে বোঝানো হয়েছে। এবং প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এখানে সন্তান বলতে সক্ষম ও সামর্থ্যবান ছেলে ও কন্যা উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানদের নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করিতে হইবে।’ ‘কোনো সন্তান তাহার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাহার, বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করিতে বাধ্য করিবে না।’

এ আইন অনুসারে পৃথকভাবে বসবাস করলেও মা-বাবার সঙ্গে সন্তানরা নিয়মিতভাবে দেখাসাক্ষাৎ করবে এবং যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে প্রদান করবে। আবার যাদের মা-বাবা নেই কিন্তু দাদা-দাদি বা নানা-নানি আছে যাদের ভরণপোষণ করা সেই বাবা বা মায়ের দায়িত্ব ছিল তাদেরই বাবা মায়ের সে দায়িত্ব পালন করতে হবে অর্থাৎ ভরণপোষণ করতে হবে। এ বিষয়ে ওই মা-বাবার সংশ্লিষ্ট থানার আমলি আদালতে লিখিত অভিযোগ করলে আদালত তা গ্রহণ করতে পারবেন।

শাস্তির বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে আপনার সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, তা অনাদায়ে তিন মাস কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

আবার নিকটাত্মীয় যদি এ ক্ষেত্রে বাধা দিতে আসে তার জন্যও রয়েছে সতর্কবার্তা। কারণ সমান শাস্তি সে আত্নীয়র জন্য ও অপরাধে সাহায্যকারী হিসেবে রয়েছে, সে স্ত্রীই হোক বা অন্য কোনো আত্মীয় হোক।

এ আইনে সুবিধা হলো আদালত চাইলে এ অভিযোগ আপস নিষ্পত্তির জন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মেয়র বা কমিশনার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার বা যেকোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারবেন। এতে উভয় পক্ষকে অবশ্যই শুনানির সুযোগ দিতে হবে।উপরোক্ত ব্যক্তির কাছে নিষ্পত্তি করা অভিযোগ আদালতের নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এখন পর্যন্ত এই আইন তৈরি হয়নি।একমাত্র বাংলাদেশের সরকারই সংসদে এ আইন পাস হয়েছে। বিষয়টা এটাই যে আমাদের সংস্কৃতি এখনো এতটা রুঢ় নয় যে বাবা মা হোমস এ থাকবে ।বাংলাদেশের সংস্কুতির ওপর পাশ্চাত্যের এখনো শ্রদ্ধা বিদ্যমান কারন বাংলাদেশ কিছু মৌলিক মূল্যবোধ হতে কখনো সরে দাঁড়ায় নি ।তাই আইনী সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে ।

কিন্ত বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে আর বাড়ছে তার সদস্য সংখ্যাও ।কিন্ত বাবা মার সাথে ভালোবাসা কমেছে ।আর একই সাথে কমেছে বৃদ্ধ পিতামাতাকে একসাথে রাখার পারিবারিক দায়বদ্ধতা । আমরাই একসাথে থাকার সামাজিক মূল্যবোধটি গড়ে তুলতে পারছি না ।সন্তানকে গড়ে তোলার সময় আমরাই চেয়েছি সে প্রবাস জীবন বেছে নিক ।ভেবেছি কি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে দেখার কে থাকবে ? বরং সন্তানের এই ছুটতে থাকাকে পরম অহংকারের সাথে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি ।সন্তানও এমন শিক্ষিত হলেন ,এমন বড় চাকুরে হয়ে ব্যস্ত হলেন যে বৃদ্ধ মা বাবা কে দেখভাল তার চিন্তার বিষয়ই নয় ।তাহলে তো বৃদ্ধাশ্রম পারস্পরিক অবহেলাই বটে ।

অনেকের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা একটা বড় বিষয় । সংসারের বাড়তি খরচ এখন আর একার মেটানো সম্ভব হয় না ।স্ত্রীকেও চাকরী,ব্যবসা কিংবা ঘরে বসে রোজগার করার মতন কোন কাজে অংশ নিতে হয় ।যত দিন যাচ্ছে এ সমস্যা প্রকটতর হচ্ছে কেননা জীবন যাপনের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে ।অর্থাৎ একজন কর্মক্ষম মানুষকে তিনটি প্রজন্মের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে - তার নিজের, তার আগের (মা-বাবা) এবং তার সন্তানের। তিনটা প্রজন্মের দায়িত্ব নেয়ার মত অর্থনৈতিক অবস্থা সবার থাকে না ।তার ওপর প্রবীন সদস্যদের নিয়ে যত্নের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা।এবং অন্যান্য বয়স শ্রেণীর তুলনায় প্রবীণদের স্বাস্থ্য চাহিদা অনেক বেশি জটিল এবং ব্যয়বহুল। অনেকের ক্ষেত্রেই সে ব্যয় নির্বাহ করার সক্ষমতা থাকে না ।শুরু হয় পারিবারিক কলহ ।বাংলাদেশে প্রবীণদের সেবায় প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে পুরনো সংগঠন, প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বলছেন, প্রবীণদের বিষয়ে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এ বিষয়টি আগে থেকেঅনেকেই বুঝতে চান না। যার ফলে বার্ধক্য আসলে তখন হিমশিম খেতে হয়।
বাংলাদেশে সরকারি চাকুরিতে পেনশনের আর্থিক নিরাপত্তা থাকলেও অধিকাংশ বেসরকারি চাকুরিতে সেটি নেই। এসব মিলিয়ে বার্ধক্যের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন, সেটা অনেকেই আমলে নেন না।

আতিকুর রহমান মনে করেন ৩০ বছর বয়সের পর থেকে একটি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করা গেলে বৃদ্ধবয়সে কিছুটা হলেও আর্থিক নিরাপত্তা পাওয়া যাবে। ।কিন্ত আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে ও ভাবিত ?এজন্য কি কোন বিনিয়োগ করছি আমরা ?

২৭ এপ্রিল ২০১৭ তে বিবিসি বাংলায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নুর-উন-নবী বলেন-" চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও মানুষের গড় আয়ু আরো বাড়বে বলেই ধরে নেয়া যায়। তরুণ জনগোষ্ঠির সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও আর মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে প্রবীণদের মোট সংখ্যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ছাড়িয়ে যাবে ।এই হারে বাংলাদেশে ২০৩০ সালের আগেই প্রবীণ জনগোষ্ঠির সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যাবে, এবং, ২০৪৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যা বেশি থাকবে।যার একটি বিশাল প্রভাব পড়বে শ্রমবাজারের ওপর। এই বয়স্ক মানুষদের যদি সমাজের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বিত না করা হয়, তাহলে তারা একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে ।এবং একজন কর্মক্ষমের ব্যক্তির আয়ের ওপর প্রভাব পড়বেই ।

এখন হিসাব করে দেখেন আমরা যারা এখন ত্রিশোর্ধ বয়স তারা্ই তখনকার বোঝা । বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য শুধু সরকারি সাহায্যই সীমিত নয়, বেসরকারিভাবেও প্রবীণদের নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় না। অন্ততঃ যতটা হওয়া উচিত ততটা যে হচ্ছে না, সেবিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রায় সবাই একমত। 'প্রবীণ বন্ধু' , প্রবীণ নিবাস,বিশিয়া বৃদ্ধাশ্রম সীমিত পরিসরে সেবা দিচ্ছেন ।যা সামনে ক্রমবর্ধমান প্রবীনদের জন্য যথেষ্ট নয় ।
তাহলে ভাবুন সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ, বিনিয়োগ ,সঞ্চয়ও পেশাদারিত্ব - কোন ক্ষেত্রেই ছাড় দেয়ার সুযোগ আছে কি?

এসব আমলে না দিলে আমরা মা-বাবা তখন ভরণপোষণের জন্য আমাদের সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে !!! আর তা না হলে উন্নত বৃদ্ধাশ্রমের ভালো সিটটি বুকিং দিতে যেন পারি তার পূর্বব্যবস্থার কথা মাথায় রাখতে হবে !!

রুমানা রশীদ রুমি।
লেখিকা





খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন