বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ ১০:৫৩:৩১ পিএম

হাজার কোটি টাকায়ও জলাবদ্ধতা কাটেনি: এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবল রাজধানী

জাতীয় | সোমবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৮ | ০৪:৩৪:২৩ পিএম

স্বস্তির বৃষ্টি নগরবাসীর কাছে এখন অনেকটাই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতায় সীমাহীন দুর্ভোগ দেখা দেয়। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলির কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি জমে যায়। গত বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, ডিএসসিসির মেয়র আর সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানরা এক বছর সময় চেয়ে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। এরই মধ্যে খরচ হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই গত কয়েক দিনের সামান্য বৃষ্টির পর রাজধানীর চিহ্নিত এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা খুব একটা কমতে দেখা যায়নি।

গতকাল রবিবার বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জলজট ও যানজট লাগে। যদিও গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। ৮টার দিকে হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায় চারদিক। সকালকে মনে হয় সন্ধ্যার মতো। এর পরই শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। আবহাওয়া অফিস জানায়, ঝড়ের সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭৩ কিলোমিটার। সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ঢাকায়। এ ছাড়া থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে বিকেল পর্যন্ত। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ঝড়-বৃষ্টির এই প্রবণতা চলবে আরো কয়েক দিন।

ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলে ড্রেন, নর্দমা নির্মাণ ও খাল পরিষ্কার করার কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, সেই পরিমাণ সুফল মেলেনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ১০ মিনিটে ১২০ মিটার ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে জেড অ্যান্ড সাকার মেশিন কিনলেও তাতে তেমন একটা লাভ হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশন মূলত নতুন লাইন তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। যে ড্রেনগুলো আছে সেগুলোর কোথায় কোথায় ব্লক হয়েছে তা পরিষ্কার করার ব্যাপারে তারা মনোযোগী নয়। ফলে নতুন করে ব্যাপক অর্থ খরচ করা হলেও পুরো নেটওয়ার্কিং না হওয়ায় সুফল মিলছে না।’

বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করতে কাজ করছে ডিএসসিসি। এরই মধ্যে তৈরি করা খসড়া তালিকায় উঠে এসেছে ডিএসসিসির ৪৮ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকার নাম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার জলাবদ্ধতাপ্রবণ এসব এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য গত দুই বছরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এ বছর সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেন নির্মাণে ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরেছে ডিএসসিসি। এরই মধ্যে প্রায় সব টাকা খরচ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া ডিএনসিসি তাদের বার্ষিক বাজেটে এ খাতে প্রায় ২৭৮ কোটি বরাদ্দ রেখেছে। এরই মধ্যে প্রায় সব টাকা খরচ করেছে এই সংস্থা। গত অর্থবছরে ডিএনসিসি নর্দমা ও ড্রেন নির্মাণে আরো ১৭৫ কোটি টাকা খরচ করে বলে জানা যায়। এ ছাড়া ডিএসসিসি তাদের একটি মেগা প্রকল্পের এক হাজার ২০২ কোটি টাকা থেকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করে কয়েক কোটি টাকা ড্রেন ও নর্দমা নির্মাণে ব্যয় করেছে। ঢাকা ওয়াসাও তাদের নিজস্ব ড্রেন পরিষ্কারের পেছনে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করেছে বলে জানা যায়। এর পরও বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকা ওয়াসার একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়াসা প্রতিবছর গড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের পেছনে ব্যয় করে থাকে। গত দুই বছরে এ সংস্থা ১০ কোটি টাকার মতো ব্যয় করেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ দরকার। সেটি মন্ত্রণালয়ে চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। ফলে ওয়াসা কাজ করতে পারেনি। আর দুই সিটি করপোরেশন থেকে ড্রেন ও নর্দমা নির্মাণে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলেও এর সুফল মিলছে না। কারণ সংস্থা দুটির পরিকল্পনা আর ডিজাইনে ত্রুটি রয়েছে।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, শান্তিনগর এলাকার জলাবদ্ধতা কমাতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু সেখানেও এখন বৃষ্টি হলে পানি জমে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা শান্তিনগর এলাকায় পানি নিষ্কাশনে সব কাজ শেষ করেছি। এখন ওয়াসার টিটিপাড়া পাম্পের সক্ষমতা না বাড়ালে পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না। তাই ওয়াসাকে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দাপ্তরিকভাবে পত্র দিয়েছি। আর ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর এলাকার জলাবদ্ধতা রোধে হাতিরঝিল প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাজ করছে।’

বৃষ্টিতে জলজট-যানজট : গতকাল বৃষ্টির ফলে মিরপুর এলাকার লোকজন সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়ে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেট্রো রেলের কাজ চলায় সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি আর নির্মাণসামগ্রী রাখার কারণে চলাচলের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে সড়ক। বৃষ্টির পানি আর কাদার কারণে রাস্তায় গাড়ির চাকা ঘোরানোই ছিল চ্যালেঞ্জ। সকালের বৃষ্টির পর মিরপুর ১০ নম্বর থেকে থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে, ১৪ নম্বর সেকশন, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহিমপুর ও কচুক্ষেত এলাকার বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে কাজীপাড়া পর্যন্ত দুপুর নাগাদ ভয়াবহ যানজট ছিল।

কাজীপাড়ায় বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মাজহারুল হক দুপুর আড়াইটার দিকে বলেন, ‘প্রায় আড়াই বছর ধরে মেট্রো রেলের কাজ চলছে এই এলাকায়। কবে শেষ হবে জানি না। একটি পারিবারিক কাজে যেতে হয়েছিল পুরান ঢাকায়। সকাল পৌনে ৮টায় মিরপুর ১০ নম্বরে বাসে উঠি। ওঠার পরই শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টি। গাড়ি চলছিলই না। একটু এগোতেই সড়কে পানি। মেট্রো রেলের কাজ চলায় স্বাভাবিক দিনেই এ এলাকায় চলা যায় না। আজ বৃষ্টির কারণে রাস্তা চলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে ১০ নম্বর থেকে কাজীপাড়া পৌঁছাতেই লেগে যায় প্রায় দুই ঘণ্টা।’

ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত সড়ক ছিল পানির নিচে। সকাল ১১টার দিকে মিরপুর-১০ থেকে গুলিস্তানের উদ্দেশে ছেড়ে আসা শিখর পরিবহনের চালক মুরাদ হোসেন বলেন, ‘মিরপুর-১০ থেকে ফার্মগেট আসতে লেগেছে দেড় ঘণ্টা। ফার্মগেট থেকে করাওয়ান বাজার আসতে লেগেছে আধাঘণ্টা। গাড়ির চাকা চলছেই না।’ তিনি বলেন, ‘এডি কোনো রাস্তা হলো? কোনো দিনও হুনিনাই (শুনিনি) অন্য কোনো দেশে রাস্তায় এরম পানি জমে। দেহেন না, রাস্তার পাশে ডেরেন (ড্রেন) ভরা। দেখভালে কেউ আছে বলে মনে হয় না। পানি কেমনে নামব।’

দুপুর ২টার পরও ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকতে দেখা যায়। পশ্চিম রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোডের বিভিন্ন সড়কে দেখা যায় নিষ্কাশন ড্রেন থেকে উপচে পড়া ময়লা পানিতে রাস্তা সয়লাব। রোকেয়া সরণি ও জাহাঙ্গীর গেট এলাকার সড়কের এক প্রান্তেও জলাবদ্ধতা দেখা গেছে দুপুর নাগাদ।

-কালেরকণ্ঠ

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন