বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৬:৩১:৪৮ এএম

বাথরুমের পানিও রোগীদের কিনে আনতে হয় যে হাসপাতালে

জেলার খবর | বাগেরহাট | বুধবার, ২ মে ২০১৮ | ১১:২৬:২৮ এএম

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বাথরুমের পানিও রোগীদের কিনে আনতে হয়।

এমনকি এই হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদেরও পানির তীব্র সংকটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অভাব সুপেয় পানিরও। গত ৩ মাস ধরে হাসপাতালে খাবারের, বাথরুমে ব্যবহারের ও যাবতীয় ধোয়া-মোছার জন্য বোতলজাত পানি কিংবা বিভিন্ন পুকুর ডোবা-নালার পানি কিনে প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের অভ্যন্তরের একমাত্র পুকুরটিও পানিশূন্য। পৌর কর্তৃপক্ষের নামমাত্র সরবরাহকৃত পানিতে চাহিদা পূরণ না হওয়াতেই মূলত এ পানি সংকট বিরাজ করছে। এই অবস্থায় ডোবা-নালার পানি ব্যবহার করায় প্রতিনিয়ত পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।

ভুক্তভোগী রোগীসহ সাধারণ মানুষের অভিযোগ হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার কারণেই মূলত এ পানি সমস্যার নিরসন হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ২৩ মে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০০৭ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। আর্ন্তজাতিক সমুদ্র বন্দর মোংলা ও পৌর শহরসহ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের আড়াই লাখের অধিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা সরকারি এই হাসপাতালটি।

শুধু মোংলা উপজেলাই নয় পার্শ্ববর্তী রামপাল, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, দাকোপ ও সুন্দরবনের বনজীবীরাও দুর-দুরান্ত থেকে রোগীরা ছুটে আসে এই হাসপাতালে। চিকিৎসা নিতে এসেও ডোবা-নালার অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার করায় তারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী শাহিদা বেগম (৩৭) বলেন, ‘১৫দিন ধরে এই সরকারী হাসপাতালে আছি, এখানে খুব পানির কষ্ট। খাবার পানি নেই, টয়লেটের পানি নেই। টাকা দিয়ে পানি কেনার সামর্থ্যও নেই, কি করবো- যাবো কোথায়।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফরিদা বেগম (৪৩) বলেন, ‘আমার পেটে ব্যথা, নার্সরা বেশি বেশি পানি খেতে বলেছে পানি নেই তা খাবো কি। ৩ দিন পর রোববার গোসল করলাম তাও পানি কিনে এনে।’

হাসপাতালের পরিছন্ন কর্মী মিথিলা রহমান বলেন, ‘গত ৩ মাস ধরে হাসপাতালে পানির এ সমস্যা চলে আসছে। পানির অভাবে পরিস্কার পরিছন্নতার কাজ করা যাচ্ছে না। যার ফলে হাসপাতালে নোংরা অবস্থা বিরাজ করছে। যারা স্টাফ আছি আমারও প্রচন্ড পানি সংকটে ভুগছি। ডায়রিয়ার রোগীরা টয়লেটে গিয়ে পানি পাচ্ছে না। কেউই পানির ব্যবস্থা করছে না।’

মোংলা হাসপাতালের কর্তব্যরত নার্স ফাতেমা বলেন, ‘পানির কষ্ট সকলেরই হচ্ছে। রোগীদের দেখাশুনার পর হাত ধুতে হয়, সেই হাত ধোয়ার পানিটুকুও নেই, বাথরুমে যেতেও অসুবিধা হয়। বাইরে থেকে বোতল ও বালতি করে পানি এনে আমাদের প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে।’

হাসপাতালের বাবুর্চি আব্দুল সাত্তার শেখ বলেন, ‘আমি পানির অভাবে তিন চারদিন পরপর গোসল করি। পৌরসভা থেকে যে পানি সরবরাহ করা হয় তা খুবই কম। তাতে আমাদের চাহিদা মিটে না। রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছা ও রোগীদের খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এখানে নেই। আমাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে পানির জন্য। দেখার কেউ নেই।’

মোংলা হাসাপাতালের মেডিকেল অফিসার ড. মো. রাফিউল হাসান বলেন, ‘পানির সংকটের কারণে আমি নিজেই পানি কিনে ব্যবহার করছি। রোগীরা পানির জন্য হাহাকার করছে কোথা থেকে পানি দিবো আমরা। গত ৩ মাস ধরে পানির অভাবে পরিছন্ন কর্মীরা নিয়মিত পরিস্কার-পরিছন্নতার কাজ করতে পারছে না। অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহারের ফলে এখানে ডায়রিয়া, পেটের পীড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালের পানিও পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয় এটা নিয়ে আমরাও খুব ভয়ের মধ্যে আছি কারণ এই অবস্থায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, ‘হাসপাতালে সুপেয় পানির প্রচন্ড সংকট রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক এলাকার পুকুরটিও শুকিয়ে যাওয়ায় মুলত পানির সমস্যা বেশি দেখা দিয়েছে। এছাড়া পৌরসভা পাইপ লাইনের মাধ্যমে দিনে একবার যে স্বল্প পরিমাণ পানি সরবরাহ করে থাকে তা হাসপাতালের চাহিদার তুলনায় খুবই নগন্য। তাই এ সংকট নিরসন সম্ভব হচ্ছে না।’

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. অরুণ চন্দ্র মন্ডল মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পানি সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এটি মূলত সিভিল সার্জন কিংবা টিএইচও’র কাজ বা দায়িত্ব নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে তারাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন