রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৪:১৬:৩১ পিএম

চট্টগ্রামে ২৫ হাজার টাকায় দফারফা গৃহকর্মী নিহতের ঘটনা!

জেলার খবর | চট্টগ্রাম | সোমবার, ২১ মে ২০১৮ | ০৩:০৪:৪৬ এএম

চট্টগ্রামে মাত্র ২৫ হাজার টাকায় দফারফা হলো গৃহকর্মী চাঁদমনি ওরফে ইয়াছমিন (১৫) নিহতের ঘটনা। মামলা না করতে ধমকি দিয়ে সাদা কাগজে সই নিয়ে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে লাশসহ ইয়াছমিনের মা-বাবাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেয়ের জীবনের মূল্য মাত্র ২৫ হাজার টাকা? মেয়ের লাশের সাথে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে বলা হয়, লাশ নিয়ে চলে যেতে। ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন নন্দনকানন একে ম্যানসনের ৯ম তলায়। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটলেও গণমাধ্যমের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তড়িঘড়ি করে এ ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়।

রোববার এ ঘটনা জানাজানি হয়।

পরিবারের দাবি চাঁদমনিকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলছে। পুলিশের কাছে গেলেও মামলা নেয়নি।

জানা গেছে, নন্দনকানন একে ম্যানসনের ৮ম তলায় ব্যবসায়ী জাফর আহমেদের বাসায় গৃহকর্মীর
কাজ করত চাঁদমনি ওরফে ইয়াছমিন (১৫)। একই ভবনের ৯ম তলায় গোলাম সরোয়ার এর বাসায় কাজ করতো চাঁদমনির অপর দু'বোন জোৎসনা মনি ও সূর্যমনি। গত পাঁচ
বছর ধরে এ বাসায় চাঁদমনি কাজ করে আসছিল। কিন্তু দরিদ্রতা আর সৌন্দর্য দুটোই কাল হলো চাঁদমনির জীবনে।

সুত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে একে ম্যানসন এবং পাশের ভবন কাদের
টাওয়ারের মাঝামাঝি করিডোর গলি থেকে উপর হয়ে পড়ে থাকা ইয়াছমিনের লাশ
উদ্ধার করে পুলিশ।

লাশের সুরতহালকারী কোতোয়ালী থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক রুহুল আমিন বলেন,
লাশের দু'পা এবং একহাত, পাজরের হাড় ভাঙা ছিল। মাথার এক পাশ ফেটে মগজ বের হয়ে যায়। চোখের উপরেও আঘাতের চিহ্ন।

তিনি বলেন, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে তা বলা যাবে। তবে এটি হত্যা না আত্মহত্যা এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

এদিকে চাঁদমনি আত্মহত্যা করেছে বলে জোর দারি করেছেন জাফর আহমেদের পরিবারের
লোকজন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ভবনের একটি সূত্র জানায়, মেয়েটিকে বেদম মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে কৌশলে তাকে ভবনের উপর থেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়।

জাফর আহমদের শ্যালিকা সাবিনা মুক্তা বলেন, তাদের বাসার ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে নিষেধ করা এবং বকাঝকা করার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে চাঁদমনি আত্মহত্যা করে।

সাবিনা মুক্তা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার ছেলেকে বাসার সামনে দিয়ে চাঁদমনি চলে যায়। এরপর তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর বিষয়টি চাঁদমনির মা-বাবা এবং পুলিশকে জানানো হয়। অবশেষে রাতে ভবনের নিচে চাঁদমনির নিথর লাশ পরে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন তারা। এর পর পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

সাবিনা বলেন, তাদের ড্রাইভার সাহেদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে চাঁদমনির। বৃহস্পতিবার বিকেলে ভবনের ছাদের উপরে দুজনে কথা বলতে দেখে জাফর আহমেদ তাদেরকে বকাবকি করেন। এরপর চাঁদমনির বোন বিষয়টি নিয়ে চাঁদমনিকে জিজ্ঞাসা করলে চাঁদমনি বোনকে বলে তোদেরকে মজা দেখাবো। তিনি বলেন, বকাঝকা
করার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে।

এদিকে জাফর আহমদের বাসায় তার স্ত্রী হিরার সাথে এ প্রতিবেদক কথা বলতে
চাইলে হিরার বোন সাবিনা বারবার নিজেই কথা বলেন। এসময় হিরাকে কথা বলতে
দেননি সাবিনা। এছাড়া বাসার গৃহকর্তা জাফর আহমদকেও পাওয়া যায়নি।

সাবিনার কাছে জাফর আহমদের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে কৌশলে সাবিনার স্বামী গোলাম সরোয়ারের মোবাইল নম্বর দেন। এ প্রতিবেদক উক্ত নাম্বারে ফোন করে চাঁদমনির মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম সরোয়ার অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, কেন এত যন্ত্রণা দিচ্ছেন? থানা বা কোর্টে যান, সেখানে গিয়ে বিস্তারিত জানুন।

এদিকে ড্রাইভার সাহেদ বিবাহিত বলে চাকরি নিলেও পরে জানা গেছে তিনি অবিবাহিত।

ঘটনার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে একে ম্যানসনের ৮ম তলায় জাফর আহমদের ফ্ল্যাটে
গিয়ে দেখা যায়, তাদের বাসায় তালাবদ্ধ। এর পর উপরে ৯ম তলায় গিয়ে গোলাম সরোয়ারের বাসায় পাওয়া যায় জাফর আহমদের স্ত্রী হিরাকে। কিন্তু পুরো পরিবারের লোকজনকে সিন্ডিকেট হয়ে কথা বলতে লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে জাফর আহমদের ড্রাইভার সাহেদকে আটক করলেও পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে সাহেদ জাফর আহমদের বাসায় গাড়ি চালাচ্ছেন। ড্রাইভার সাহেদের
সাথে প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ আনলেও তার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।

এ বিষয়ে চাঁদমনি ওরফে ইয়াছমিনের মা শাফিয়া বেগম বলেন, জাফর আহমদের শ্যালিকা মুক্তা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফোন করে বলেন যে, চাঁদমনিকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে রাতে ফোন করে বলেন, চাঁদমনি আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেন, আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য রয়েছে।

শাফিয়া বেগম বলেন, আমার মেয়েকে মেরে লাশ উপর থেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার তারা চাঁদমনিকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

থানায় মামলা করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গরীব বলে পুলিশ মামলা নেয়নি। বলেছে, মেয়ে মরে গেছে মামলা করে কী হবে? ওরা বড় লোক, ওদের সাথে লড়াই করে কী হবে। টাকাগুলো নিয়ে চলে যান। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসলে মামলা হবে।

তিনি বলেন, ২৫ হাজার টাকা দিয়ে সাদা কাগজে সই নিয়ে মেয়ের লাশ বুঝিয়ে দিয়ে আমাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

চাঁদমনির ছোট বোন জোৎসনা মনি বলেন, তার বোন আত্মহত্যা করেনি। নিশ্চয় কোনো
ঘটনা ঘটেছে, যা আড়াল করা হচ্ছে।

জোৎসনা জানান, তাদেরকে জাফর সাহেব’র স্ত্রী হিরা চাঁদমনির সাথে কথা বলতে দিতেন না। এ ছাড়া চাঁদমনিকে প্রায় সময়ই মারধর করা হতো।

চাঁদমনির ভাই রিদওয়ান বলেন, তার বোন আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে।

রিদওয়ান আরও বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন করা দরকার।

এ ব্যাপারে কোতোয়ালী থানার ওসি মো. মহসিন বলেন, চাঁদমনি নামে এক গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করার পর এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে চাঁদমনিকে হারিয়ে শোকের মাতম চলছে ওই পরিবারে। শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। পরিবারের সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত দাবি করেন।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন