রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১০:৫১:৪৯ পিএম

ইয়াবা বিক্রিতে নারী ডিলার, রেঙ্গুন রহিমের নতুন কৌশল

জাতীয় | শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ | ০৩:০৪:৩৫ পিএম

র‍্যাব ও পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে গত ১০ দিনে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে গা-ঢাকা দিয়েছে মাদক ব্যবসার মূল হোতারা। এই কয়েকদিনে বিপুল মাদক বিক্রেতা গ্রেফতার হলেও মূল ব্যবসায়ীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার আড়ালে। অভিযানের কারণে রাজধানীতে মাদক সেবন ও যত্রতত্র বিক্রি কমেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে মাদকের বড় কারবারীরা আত্মগোপনে থেকে নারী মাদক বিক্রেতাদের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশে মাদকসেবীদের সিংহভাগই এখন ইয়াবায় আসক্ত। গত একদশক ধরে এই ভয়ংকর মাদক দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে যেসব মাদক ব্যবসায়ীর নাম ওঠে এসেছে তাদের একজন মিয়ানমারের নাগরিক আবদুর রহিম (ওরফে রেঙ্গুন রহিম)। বাড়ি মংডুতে হলেও রেঙ্গুনে বসেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ইয়াবা বাজারের বড় একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে সে। সমূদ্রপথে রহিমের পাঠানো ইয়াবার বড় চালান চট্টগ্রাম হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। তিনধাপে চলে তার ইয়াবা কারবার। চালন খালাসের দায়িত্বে চট্টগ্রামে নিজের কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়োগ দিয়েছে রহিম। মিয়ানমারের নাগরিক হলেও তারা নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করে দেশজুড়ে গড়ে তুলেছে সিন্ডিকেট। জেলায় জেলায় ইয়াবা পাচারে তারা নিয়োগ এজেন্ট। এসব এজেন্ট মুলত পাইকারি ইয়াবা ব্যবসায় সম্পৃক্ত। পাড়া-মহল্লার ডিলারদের কাছে তারা পাইকারি দামে ইয়াবা বিক্রি করে থাকে। তাদের কাছ ইয়াবা সংগ্রহ করে দ্বিগুণ দামে গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করে থাকে ডিলার অর্থাৎ খুচরা ব্যবসায়ীরা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদক বিরোধী অভিযানে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত বা গ্রেফতার হচ্ছে মুলত খুচরা ব্যবসায়ী ডিলাররাই। পাইকারী ব্যবসায়ী ইয়াবার এজেন্টর নিরাপদে গাঁ ঢাকা দেওয়ায় রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযানে পর থেকে তাদের ব্যবসায় মন্দভাব দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠতে নতুন কৌশলে মাদকব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পায়ঁতারা করছে। ইয়াবার গডফাদার রেঙ্গনের রহিমের এসেছে নতুন প্রেসক্রিপশন।রহিমের নির্দেশনা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতা অর্থাৎ ডিলার হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছেন নারীদের। মাদক ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী যুক্ত থাকলেও নানা কারণেই তারা থাকছেন র‍্যাব ও পুলিশের নজরদারির আওতার বাইরে। অভিযানে নারী মাদকবিক্রেতা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি একটাও। তাই খুচরা পর্যায়ে নারী ডিলারদের দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রহিম।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সম্প্রতি নগরীরর হালিশহর শ্যামলী আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান ইয়াবার চালিয়ে তেরো লাখ ইয়াবাসহ আশরাফ, হাসান ও রাশেদ মুন্না নামে মিয়ানমারের তিন নাগরিককে।তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে রেঙ্গুনে বসে মিয়ানমারের নাগরিক আবদুর রহিমের ইয়াবাপাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং ইয়াবা ব্যবসা নির্বিঘ্নে রাখার নতুন কৌশল সম্পর্কে।গ্রেফতার তিনজনের বাড়ি মিয়ানমারের মংডুতে হলে তারা সপরিবারে বসবাস করছে চট্টগ্রাম শহরেই। নিরাপদে বাংলাদেশে ব্যবসা চালাতে তারা তৈরি করেছে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র। জেলায় জেলায় রয়েছে তাদের এজেন্ট। ওইসব এজেন্টের সঙ্গে বিকাশে লেনদেনের মাধ্যমে পৌছে দেয় ইয়াবার চালান।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ–কমিশনার (ডিসি) মো. শহীদুল্লাহ জানান, রেঙ্গুনে অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক ইয়াবা ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের ডান হাত হিসেবে বাংলাদেশে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে আশরাফ, হাসান ও রাশেদ মুন্না নামের মিয়ানমারের এই তিন নাগরিক। গত সাত বছর ধরে রেঙ্গুনের রহিমের ইয়াবা কারবার দেখভালের দায়িত্ব ছিল তাদের উপর। সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ায় এই তিন ইয়াবা এজেন্ট আত্মগোপনে যাওয়ার পাঁয়তারা করছিল।

ডিসি শহীদুল্লাহ আরো জানান, গ্রেফতারের পর তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে ইয়াবা সিন্ডিকেট সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর বহু তথ্য। নতুন কৌশল হিসেবে তারা নারী ডিলারের মাধ্যমে ইয়াবা পাচার চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল। তাদের ইয়াবা সিন্ডিকেটের একটা বড় তালিকা পুলিশের হাতে এসেছে। সেই তালিকা ধরে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এরই মধ্যে জুবায়ের ওরফে রিদোয়ান, নুরআ লম, আলমগীর হোসেন,আহসান হাবীব নামের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ইয়াবা ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের ব্যবসা একসময় ছিল ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতানাম ঘিরে। পরে ওইসব দেশে প্রশাসনের নজরদারি বাড়লে বিকল্প বাজার হিসেবে ২০০৮/২০০৯ সালের দিকে রহিম বাংলাদেশ বেছে নেন। ধীরে ধীরে বাংলাদেশই হয়ে ওঠে তার বড় বাজার। মংডুর সিকদার পাড়ার আবদুর রহিম বসবাস করে মিয়ানমারের রেঙ্গুন শহরে। রেঙ্গুনে নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে। তার বাবার নাম আবদুল মতলব. পেশা জেলে। রহিম বিয়ে করেছে ফুফাতো বোন আসমা বিবিকে। নেওয়াজ উদ্দিন (২১) ও শাবানা (১৮) নামে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের অন্যতম হোতা আবদুর রহিম একাধিক বার হজ করেছে। পাসপোর্ট ছাড়াই বহুবার বাংলাদেশে এসে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অবস্থান করেছে। বছর দুয়েক আগে একমাস রহিম অবস্থান করে চট্টগ্রামের একটি অভিজাত হোটেল।

রহিমের বাংলাদেশের ইয়াবা পাচারের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, রোহিঙ্গা জুবায়ের ওরফে রিদোয়ান পেশাদার ইয়াবা ব্যবসায়ীই হলো রহিমের সবচেয়ে বড় এজেন্ট। বৈবাহিক সূত্রে তাদের মধ্যে রয়েছে আত্মীয়তা। জুয়াবের নগরীর বায়েজিদ মোজাফফর নগরে সাত বছর আগে তৈরি করেছে পাঁচতলা ভবন। কয়েকবছর আগে আন্তর্জাতিক ইয়াবা পাচারকারী আবদুর রহিম যখন বাংলাদেশে এসেছিল তখন বিলাসবহুল এ ভবনেই জুবায়েরের সাথে ছিল বেশ কয়েকদিন। সমূদপথে জেলা নৌকায় আসা রহিমের ইয়াবা চালান খালাসের দায়িত্ব ছিল তার। জুবায়ের কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী ইয়াবার বড় চালান পৌছে দিতো এজেন্টদের কাছে। রাজধানীর উত্তরা, মহাখালি, বসুন্ধরা, রামপুরা, মিরপুর, বা্ড্ডা ও সাভার এলাকায় এজেন্টেদের কাছে ইয়াবা চালান পৌছে দেওয়ার কাজ করতো সে।

গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দারা জানতে পারে, দেশের অন্তত ১০টি জেলায় রহিমের ইয়াবা পাচার হতো। জেলাগুলো হলো- বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং উত্তরবঙ্গের চারটি জেলা। গ্রেফতার হওয়া ইয়াবা কারবারিরা গোয়েন্দাদের জানায়, সম্প্রতি র‍্যাব ও পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান ও হতাহতের ঘটনার প্রভাব পড়েছে তাদের ইয়াবা চোরাচালানে। রেঙ্গুনে অবস্থানকারী রহিমও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। ইয়াবা ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে তিনি নারী ডিলার নিয়োগ এবং তাদের মাধ্যমেই খুচরা বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী কাজ করে সুফলও পাচ্ছিলেন রহিমের এজেন্টরা। রহিম সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন গ্রেফতার তাদের সবাই এখন গা ঢাকা দিয়েছে।

-তথ্যসূত্র: পূর্বপশ্চিবিডি

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন