সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৭:১৭:২১ এএম

মর্মে মর্মে মৃতপ্রায় চিকিৎসকেরা

খোলা কলাম | রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ | ০৫:৪৮:২৩ পিএম

প্রতীকী ছবি

দিন গভীর রাতে প্রায় সেহরীর সময় হঠাৎ বড় বোন অসুস্থ হয়ে পড়ল ।দ্রুত ছুটে গেলাম হাসপাতালে।রোগী আসার আগেই ফর্মালিটি সেরে নিতে চাইলাম ।রিসিপশনে যেতেই আমাকে বলা হলো জরুরী বিভাগে চিকিৎসক যদি রোগী রিসিভ করেন তবেই তিনি টিকিট কাটবেন ।জরুরী বিভাগের ডাক্তার জানালেন যদি রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয় তবে অন্য হাসপাতালে নেয়া ভালো কারণ তাদের সীট খালি নাই ।আমি আমার পরিচয় জানালাম। বোঝালাম ঠিক কতটুকু সেবা পেতে আমি সেখানে রোগীকে নিয়ে গেছি ।

অর্থাৎ আমাদের বাড়িতে চিকিৎসক আছেন ।যিনি রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন ।কিন্তু রোগীর বুকের ব্যাথা বৃদ্ধি ও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় তিনি একটি ইমার্জেন্সী ইসিজির পরামর্শ দেয়ায় হাসপাতালে যাওয়ার সঙ্গত কারণ জানালাম ।এবার কর্তব্যরত চিকিৎসক নড়ে চড়ে বসলেন ।রোগীকে দেখবার জন্য তিনি রাজী হলেন এবং টিকিট কাটতে বললেন ।
এখানে যে বিষয়টি আমার দৃষ্টিগোচর হলো তা হচ্ছে টিকিট কাটার পর উক্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকের আইনী দায়বদ্ধতা তৈরী হয় ।

তাই যদি ওই হাসপাতাল বা চিকিৎসকের পক্ষে রোগীকে ম্যানেজমেন্ট করার সাপোর্ট দেয়া সম্ভব না হয় তখন তারা রোগী রিসিভ করেন না ।বরং অন্যত্র যাবার রেফারেন্স প্রদান করেন ।প্রশ্ন উঠতেই পারে একজন সাধারণ রোগী অসুস্থ হলে বিশেষ করে ইমার্জেন্সী সুবিধা পেতে কিভাবে জানবে তার নির্দিষ্ট করে কি অসুখ হয়েছে এবং তাকে কোন হাসপাতালের দারস্থ হতে হবে? এক্ষেত্রে নিকটস্থ যেকোন হাসপাতাল কি তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করার সুবিধা রাখবে না?নাহলে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে রোগীর আশঙ্কা আরও বৃদ্ধি পাবে,তাই নয় কি?

বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে সদর হাসপাতালগুলোতে বা সরকারী হাসপাতালে সকল রোগের চিকিৎসা সুবিধা সম্বলিত থাকে ।যা অনেক বেসরকারী হাসপাতালে দেওয়া সম্ভব হয় না ।যন্ত্রপাতির সংকট ও বাড়তি রোগীর চাপ নিতে পারে না ।

রাজধানী শহরে‘ টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা নেব তাহলে রোগী কেন সেবা পাবে না’ এমন প্রবণতা রোগীর সাথে এটেনডেন্সদের ভেতর বেশী দেখা যায় ।তাই রোগীর পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে চিকিৎসকের ওপর চড়াও হবার ঘটনা দিনে দিন বেড়ে চলেছে ।আর মিডিয়া তা ফলাও করে প্রচার করে সুযোগে ভেতরে ভেতরে হাতিয়ে নিতে পারে বড় অংকের বিজ্ঞাপন ।এমন বিড়ম্বনা এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি কিছুটা কৌশল অবলম্বন করেই বা ক্ষতি কি?
মাঝে পড়ে রোগী আর চিকিৎসকের ভেতর সম্পর্কে দেখা দেয় টানাপোড়ন ।রোগী খুব সহজেই বলতে পারেন ওই ডাক্তার গলাকাটা ।মানে চিকিৎসা সেবা যে অতি মানবিক আর সম্মানের সেটি দিনে দিনে মানুষের কাছে অগ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠে ।

হাসপাতালের সেবা নিয়ে আমার একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল বছর দুয়েক আগে ।আমি বাচ্চাদের নিয়ে সেবার একা খুলনা শহরে বেড়াতে গেছিলাম ।আমার বাচ্চাদের একটু ঠান্ডা কাশির সমস্যা আছে,সেখানে গিয়ে ছোট মেয়েটার কাশি বাড়ল ।তাই তাকে নেবুলাইজেশন করতে হবে ।তার শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাবা আমাকে ফোনে প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিলেন ।কিন্ত সোনাডাঙ্গা বাসস্টান্ডের নিকটস্থ কোন ফার্মেসীতে আমি নেবুলাইজেশন মেশিন পেলাম না । তাই নেবুলাইজ করতে নরমাল স্যালাইনের সাথে সালবিউটামল ও ইপ্রাভেন্ট এ তিনটি কিনে নিতে চাইলাম ।যাতে করে কোন হাসপাতালে বা ফার্মেসীতে মেশিন পেলে নিজেই নেবুলাইজ করতে পারি ।কিন্ত প্রায় ১৫-২০ টি ফার্মেসী তে ওষুধগুলো পেলাম না ।

একটিতে সালবিউটামল পেলেও ইপ্রাভেন্ট আর পেলাম ই না ।অগত্যা এক হাসপাতালে ঢুকলাম ।অন্তত সালবিউটামলই চলুক । কর্তব্যরত নার্স জানালো তাদের কাছে নেবুলাইজ করার ঔষধ আছে ।আমি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষন করতে আবারো বলছি নার্স বলেছে তার কাছে নেবুলাইজ করার ঔষধ আছে ।একজন চিকিৎসকের সাথে সংসার করি বলে আমার সন্তানদের এই দীর্ঘ ৮/১০ টি বছরের চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্রে আমি আগে থেকে জানতাম চিকিৎসক কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইপ্রাভেন্ট টি দেন না ।সালবিউটামলই যথেষ্ট ।

কিন্ত আমার বাচ্চাটির ক্ষেত্র সেসময় ইপ্রাভেন্ট প্রযোজ্য ছিল ।তাই সবিস্তারে নার্সকে জানালাম ।কিন্ত নার্স গুরুত্ব না দিয়ে বললেন তাদের কাছে যে ওষধটি আছে তাতেই হবে ।আমি তার কাছে ওষধটি দেখতে চাইলাম এটা জানতে সে কি ইপ্রাভেন্ট ছাড়াই নেবুলাইজ করবে কিনা ।কিন্ত সে দেখাতে নারাজ ।তিনি জানালেন আমার আপত্তি থাকলে যেন অন্য হাসপাতালে যাই ।কিন্ত ততক্ষনে বাইরে ঘুরে আমি জেনেই গেছি অন্যত্র গেলে বাচ্চাটার আমার নেবুলাইজ করাই হবে না ।রাজি হওয়াটাই উচিত হবে ।তবুও আমি দ্বিধান্বিত ।কি করব ভাবছি -সাহেবের কাছে একটি ফোন দিয়ে নিশ্চিত হব এ ঔষধে আপাতত চলবে কিনা ইত্যাদি ।এর মধ্যে একজন আয়া এসে নার্সকে পাশ থেকে ঔষধটি দেখাতে বললেন ।তার কথার অর্থ ঔষধটি দেখালে এমন কি বা হবে ।নার্স দেখলাম আয়ার সাথে ফিসফিস করে কি বলছে ।আমার সন্দেহ হলো ।এবার তো আমি ঔষধ না দেখে বাচ্চাকে দিতে দেবই না ।নার্সও দেখাবে না ।এবং সেবা না নিয়েই আমাকে চলে আসতে হবে উপক্রম হলো ।

আমরা বেরিয়েই পড়ছিলাম ।কিন্ত সাথে আমার দেবরের স্ত্রী ।ওরা ওখানকার স্থানীয় ।তাই তাকে দেখে হাসপাতাল পরিচালনা কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বরত ব্যক্তি ভালোমন্দ জিঘ্যেস করতে এগিয়ে আসলো । আমি তাকে সবিস্তারে জানাই ।তিনি নার্সকে তলব করলেন।এবং তার তদন্তে বের হয়ে আসলো নার্স ঔষধটি একদিন আগের রাতে এক শিশুকে দেবার জন্য খুলেছিলো ।বাচ্চাটি বমি শুরু করায় ঔষধ দেবার এক পর্যায়ে থামিয়ে তারা চলে যায় ।তারই অবশিষ্টাংশ মেশিনে পড়ে ছিল এবং সে সেটাই আমাদের দিতে চেয়েছিল ।

নার্সটি যে এক ধরনের অপরাধমূলক কাজ করেছে এবং এটি সংশ্লিষ্ট থানায় জানালে সে গ্রেফতার পর্যন্ত হতে পারে আর মনিটরিং এর দূর্বলতার দায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই এর দায় থেকে মুক্তি পাবেন না জানিয়ে আমি সেখান থেকে প্রস্থান করি ।

আমার মনে আছে এক টগবগে গরম মেজাজ নিয়ে সেদিনে খুলনা শহরের যতটুকু পর্যন্ত আমার যাওয়া সম্ভব হয়েছিল আমি অসুস্থ বাচ্চাকে সাথে নিয়ে ঘুরে ঔষধ আর সেবা খুঁজেছি ।এক হাসপাতালে মেশিন পেলাম ।চিকিৎসক আশস্তও করলেন ।কিন্ত কিছুক্ষন পর নার্স ইশারায় জানালেন মেশিন থাকলেও সেটি অকেজো ।হায়!চিকিৎসক জানেনও না তাদের মেশিনটি বেশ কতদিন ধরে বিকল ।মনে প্রশ্ন জাগলো তবে কি খুলনা শহরে কোন নেবুলাইজেশন করা রোগী নাই !নাকি চিকিৎসকেরা অন্য ঔষধ দিয়ে ঝামেলা মেটান? মেশিনটি ঠিক করার প্রয়োজনবোধও নাই!

একটি এনজিও ভিত্তিক হাসপাতালে গিয়ে অবশেষে ইপ্রাভেন্ট গ্রুপের ঔষধ মেলে ।মিলল মেশিন আর সাথে একজন সার্টিফিকেটধারী চিকিৎসক ।তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন আমি উপযুক্ত স্হানে এসেছি ।আমার কাছে থাকা সালবিউটামল ,নরমাল স্যালাইন আর তাদের ইপ্রাভেন্ট তারা আমার সামনে উপযুক্ত ডোজ মিলিয়ে দিলেন ।সেদিন এভাবেই বাচ্চার চিকিৎসা মিলেছিলো ।কিন্ত বের হবার পথে এক স্ট্রোক করা রোগীর অবস্থা দেখে বুঝলাম প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে তারা বিভাগীয় শহরে পৌঁছেছে বটে ।কিন্ত সময়মত উপযুক্ত চিকিৎসা পেয়ে এ যাত্রা টিকবে কিনা সন্দেহ।

যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সরকারী চিকিৎসকেদের যারা পোস্টিং পান মফস্বল শহরে তাদের দায়িত্ব নিয়ে এবং কর্মস্থলে অবস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বারবার ।তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে মফস্বল এলাকার চিকিৎসা নিয়ে ।বাড়তি জনগনের জন্য চিকিৎসক কম তা ইতিমধ্যে সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে ।এবং স্পেশাল ক্যাডার নির্বাচন করে নিয়োগ দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে এবং তা চলমান প্রক্রিয়া।কিন্ত দোষটা তবে কেন চিকিৎসক সমাজের ওপর একতরফা ?

খুব হতাশাব্যঞ্জক খবর যে ,মফস্বল শহরের ফার্মেসী চালান যারা তারাও অনেক সময় চিকিৎসা দেবার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেন। তার নিজের দোকানের বাড়তি ঔষধ বিক্রির জন্য কখনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের ওপর বলে বসেন বিনা কারনে ঔষধ দিয়েছেন বা ডায়াগনিস্টিক করতে বলেছেন চিকিৎসক ।

রোগীও ডায়াগনস্টিক করার বাড়তি খরচ বাঁচাতে তখন ফার্মেসীর দেয়া একটি পরামর্শে চিকিৎসা নেয়ার ঘটনাও দেখা যায় হরহামেশা ।যা অনেক সময় ভ্রান্তির দিকেই যায় ।একজন ফার্মেসী ম্যান কেও জানতে হবে তার চিকিৎসা দেবার সীমাবদ্ধতা কতটুকু ।ঠিক কোন পর্যন্ত তিনি একজন রোগীকে সাহায্য করতে পারেন ।তার সীমানার বাইরে গেলে রোগী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে তা তিনি কি জানেন? গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার বা এম এল এফ চিকিৎসকের চিকিৎসা তো বাংলাদেশ চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ রকমের বিপর্যয় । অথচ গুঞ্জন ওঠে শুধু চিকিৎসকের ভূল চিকিৎসার কথা ।

উন্নত দেশে এভাবে ঔষধ বিক্রি আইনত দন্ডনীয় অপরাধ,কিন্ত আমাদের দেশে ঠিক এ জায়গাটিতে সরকারের মনিটরিংয়ের ঘাটতি এখনো বিদ্যমান । তা নিয়ে পত্র পত্রিকায় বা গন মাধ্যমে আরও প্রচারণা প্রয়োজন ।তা না তারা ব্যস্ত শুধু চিকিৎসক আর হাসপাতালের ছিদ্রান্বেষনে ।

কখনো মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের চিকিৎসকের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা হাসপাতাল ,ফার্মেসী বা চেম্বারে দাঁড়িয়ে তদারকি এবং প্রতিযোগীতার বাজারে টিকে থাকার জন্যে কমিশন লোভও চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং রোগীর উপযুক্ত চিকিৎসা পাবার পথে অন্তরায় ।ঔষধের গুনগত মান বজায় রেখে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য ঔষধ কোম্পানীগুলোর ওপর একমাত্র প্রেসার গ্রুপ চিকিৎসকেরাই হতে পারেন ।তা না করে কোম্পানীর সাথে আপোষ ঔষধের দিনে দিনে গুনগত মান খারাপের কারন ।এদেশের শিক্ষিত হোক বা অর্ধ শিক্ষিত কয়জনই বা জানেন ঔষধের মান নিয়ে ।অনেক উচ্চ শিক্ষত মানুষেরও ঔষধের ভেতরও যে ভালো মন্দ থাকতে পারে সেটা ধারনাতে নাই ।

আর বাংলাদেশর বেশীর ভাগ মানুষ অশিক্ষিত ।তারা অন্ধভাবে ডাক্তার যে ঔষধ লিখে দিয়েছেন তাই গলাধকরণ করেন ।তাহলে এ রোগীর বিশ্বাস নিয়ে খেলা করা একজন চিকিৎসকের জন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল ।যতই ঔষধ কোম্পানীর ওপর তদারকির জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট অথোরিটি থাকুক না কেন বাজারে চাহিদা না থাকলে এ রকমের ভেজাল ঔষধের কোম্পানী বাড়ছে কি করে ?যে চাহিদা তৈরী চিকিৎসক,ফার্মেসী ও কোম্পানীর আপষেই সম্ভব ।

চিকিৎসক পরিবারের একজন হয়ে বলতে পারি-‘ নিজের বাড়ির রোগী আর কমন রোগীর ভেতর কমন রোগী প্রাধান্য পাবে’ চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই ইথিক একজন চিকিৎসকের ঘরের লোকই হাড়ে হাড়ে টের পায় ।যা বাইরে থেকে অনেকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় কোনভাবেই ।চিকিৎসকের সাথে সাথে তার বাড়ির লোকের আবেগ,অনুভূতি ধুঁয়ে মুছে জলাঞ্জলি দিতে হয় যা অনেকের অজানা থাকে ।বাড়তি পাওনা সংসারে হাজারো অভাব অভিযোগ থাকলেও মানুষের কাছে শোনা –দিন শেষে টাকার বস্তা নিয়ে বাড়ি আসে ,আফসোস কি আর !মেকি হাসির আড়ালে পড়ে থাকে এক নবীন চিকিৎসকের ডিগ্রি নেবার আর বারবার আশাহত জীবনের সংগ্রামের গল্প ।চিকিৎসকদের নাজুক এ অবস্থারই সুযোগ নেয় ঔষধ কোম্পানীগুলো ।

অন্যপেশা থেকে চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার হতে তুলনামূলক বেশী সময় লাগে ।লাইব্রেরীতে ঘন্টার পর ঘন্টা শ্রম দিয়েও কঠিন এক একটি ধাপ অতিক্রম করতে বেশ বেগ পেতে হয় ।তারও যে একটি ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারে ,সে যে যন্ত্রমানব নয় সেটা অনেক সময় অনেকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় ।একজন চিকিৎসক পেশাজীবি হবার পর থেকে ২৪ ঘন্টা অন ডিউটি ।হাসপাতালে তার অবর্তমানে অন্য ডিউটি ডাক্তার থাকতেই পারেন ।কিন্ত যে রোগী ঠিক তারই সেবার এপর ভরসা করছেন তা সে রাত হোক,দিন হোক,পারিবারিক কোন অনুষ্ঠান হোক,ব্যক্তিগত সময় হোক কিংবা গভীর ঘুমে নিমগ্ন তিনি রোগীর সেবাকেই প্রাধান্য দিতে বাধ্য ।এটা কিন্ত দুই একদিনর জন্য নয় ।এটা দিনের পর দিনের ঘটনা । কিন্ত, চিকিৎসা এখন সেবা নয় ব্যবসা এহেন প্রশ্নবাণে জর্জরিত একজন নবীন চিকিৎসকের খবর চাপা পড়ে হাজারো খবরের ভীড়ে ।দেশের পয়সায় সরকারী ভর্তুকিতে পড়ে আসা সদ্য পাশ করা চিকিৎসকের হাতে স্টেথিস্কোপ আর বি পি মেশিন তার হাতে মুক্তিযুদ্ধের রাইফেলের মতন জোরালো আর শক্তিধর ।এমনি চেতনাবোধ আর চিকিৎসা সেবায় নিজের ডেডিকেশন নিয়ে নবীন চিকিৎসকেদের অনেককেই নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে রোগী বাঁচানোর আবেগও দেখা গেছে ।কিন্ত মর্মে মর্মে প্রতিদিন একটু করে মরে যায় একজন চিকিৎসকের সে ডেডিকেশন ।

এভাবে নামমাত্র মূল্যে মুখবুঁজে সেবা দিতে দিতে ডাক্তার একজন এলিয়েন সাব্যস্ত হন । রোগীরও যখন তখনের ডাক্তারের কাছে প্রবেশাধিকার নূন্যতম সৌজন্যতাবোধকে ক্ষুন করে । একবার ভাবেন যে ছাত্রছাত্রী ছোটবেলা থেকে চিকিসক হবে বলে স্বপ্ন নিয়ে সারাজীবন সেপথে ব্যয় করল তারপক্ষে কি রোগী চিকিৎসা দেবার পর যে টাকাটি হাতে গুঁজে দিল তা জাল টাকা কিনা লাইটের আলোয় বা ডিটেকটর মেশিনে আবিষ্কার করতে বসবে? কিংবা বাকিতে চিকিৎসা করেন ,আজ ফি দিতে পারছি না আরেকদিন ফি দেব রোগীর সাথে এমন দরকষাকষিতে বসবেন ? বিনা পয়সায় কজনকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব? অনেক গরীব ঘরের সন্তানও চিকিৎসক হন ।তার কাছেও তার পরিবার প্রত্যাশা করেন ।তিনি শুধু বিনা পয়সার চিকিৎসক হলে তার হাতটি তিনি কার কাছে পেতে দেবেন?গুটিকয়েক চিকিৎসকের অকর্মন্যতা বা বাজে আচরন নিয়ে ঢালাও ভাবে সমস্ত চিকিৎসক সমাজের ওপর চড়াও হওয়া বা গলাকাটা বলা কি আদৌ সমিচীন?

চিকিৎসকের হাতে দূর্ঘটনা বশত যদি রোগী মারা যায় ,কিংবা খুব আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগী চিকিৎসকের কাছে পৌঁছেছে যেখানে তার পক্ষে কিছু করার ছিল না এমন সময়গুলোতে চলে রোগী ও চিকিৎসকের আন্ত :কলহ ।একজন রোগীকে শেষ চেষ্টাটি করেও তিনি বাঁচাতে পারলেন না এরকম অবস্থায় চিকিৎসকের এমনিতে খারাপ লাগে । অপরিচিত হলেও চিকিৎসকের চোখ দিয়ে মানুষটি না বাঁচাতে পারার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে সেটা কয়জন দেখেন ?
উপযুক্ত হাসপাতালে পৌঁছাতে জরুরী অ্যাম্বুলেন্স নাম্বরটা রাখা,বাড়িতে সময়ক্ষেপন করে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক করে না তোলা, প্রাথমিক চিকিৎসা যেমন আগুনে পোড়া,বিদ্যুৎপৃষ্ঠ ,অজ্ঞান রোগীর তাৎক্ষনিক সেবা বাড়িতে দেবার জ্ঞান রাখা, যারা নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে থাকেন তাদের প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঔষধটি সাথে রাখা এবং প্রায়ই চিকিৎসকের কাছ থেকে রুটিন চেক আপ করে নেয়া , হাসপাতালে ইতিমধ্যে ভর্তি আছেন ‘ডিসচার্জ অন রিকুয়েস্ট’ বা নিজেদের সিদ্ধান্তে বাড়ি নিয়ে না যাওয়া ইত্যাদি বিষয় লক্ষ্য রাখা রোগী ও তার এটেনডেন্সের দায়িত্ব ।সেদিকটি কি কেউ খেয়ালে রাখছেন?
হুট করে জরুরী সেবা পেতে চিকিৎসকএর শরণাপন্ন হলাম আর চিকিৎসক অতি মানবীয় ,অশরীরি শক্তির মত যাদুবলে রোগীকে সুস্থ মানুষে রুপান্তর করবেন ভাবনাটা কি অমূলক নয়?চিকিৎসকও রোগীর ভেতর মানবীয় ও সৌহার্দ্য সম্পর্ক নিয়ে এখন প্রায়ই প্রশ্নতোলা হয় ।প্রায়ই চিকিৎসক আর রোগীদের ভেতর হাতাহাতির ঘটনা দেখা যায় । দেখা যায় সরকারী হাসপাতালের ইন্টার্ন ডাক্তারদের প্রায়ই অনশন বা কর্মবিরতী ।

আর রাজধানীর বড় বড় নামকরা ফাইভ স্টার হাসপাতাল গুলোতে ভূল চিকিৎসার কারণে রোগীর মৃত্যু ,বিল বাড়ানোর কারসাজিতে মৃত রোগীকে আইসিসিইউতে রেখে বিনা কারনে কালোক্ষেপন এখন পত্রিকার নৈমত্তিক খবর ।টিভি ,পত্রিকা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সেসব খবর ।আর ভাইরাল হওয়া খবরের মত ভাইরাল হয় চিকিৎসকের ওপর চড়াও হবার প্রবনতাও ।

সো কলড ‘গলাকাটা ডাক্তারদের’ আর মর্মে মর্মে মৃতপ্রায় করবেন না ।ফলাফল মেধাপাচার ছাড়া কিছুই নয় ।

রুমানা রশীদ রুমী।
লেখিকা।


খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন