শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ১০:৩১:৫৪ এএম

মাদক বিরোধী বন্দুকযুদ্ধ: ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরাম হত্যা নিয়ে বিতর্ক

জাতীয় | বৃহস্পতিবার, ৩১ মে ২০১৮ | ১২:৩৮:৫০ এএম

মাদকবিরোধী অভিযানে গত ১০ দিনে নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। গত সোমবার রাত পর্যন্ত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ১০৩ জন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, নিহতরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী৷ তবে অধিকাংশ নিহতের পরিবারের দাবি অন্যরকম।

কক্সবাজারের টেকনাফের ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন৷ এই মৃত্যুর পর থেকেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে৷ ওই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁকে নিরাপরাধ বলছেন৷ নাম বিভ্রাটের কারণে ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা একরামকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি৷ তবে র‌্যাবের দাবি, অন্তত ৪/৫টি তালিকায় একরামের নাম রয়েছে এবং সে একজন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী৷

মাদকবিরোধী অভিযানে একের পর এক ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা, শতাধিক মানুষের মৃত্যু– কী ভাবছে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন? প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘‘মাদকবিরোধী অভিযান ভালো। সেই অভিযানে যেন কোনো মানুষের মৃত্যু না হয় সেদিকে আমরা নজর রাখতে বলেছি৷ গতকালই আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র লিখেছি, এই অভিযান যেন খুবই সতর্কতার সাথে করা হয়৷ ইতিমধ্যে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷ সামনে যেন এদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়৷’’ মানবাধিকার কমিশন কি কোন ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা নিয়ে তদন্ত করছে? আসলে সেখানে কী ঘটেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে জনাব ইসলাম বলেন, ‘‘আমাদের পক্ষে এটার তদন্ত করার সুযোগ নেই, আইনগতও নেই, জনবলও নেই৷ আমরা তদন্ত করছি না, এই কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বলেছি ডিও দিয়ে যে, এই অভিযানগুলোতে যেন বিশেষ নজর রাখা হয়৷’’

টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে কক্সবাজার আওয়ামী লীগ৷ কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী মাবু ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি খোলা চিঠি লিখে একরামুল নিহত হওয়ার ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘গতকালই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা এই ঘটনা তদন্ত করে দেখবে৷ পাশাপাশি কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রেখে তাঁর পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া হবে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘১৯৮৫ সন থেকে আমি আর একরামুল হক একসাথে রাজনীতি করছি৷ এক দশকের বেশি সময় উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন৷ তাঁর এমন মৃত্যুর ঘটনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তো বটেই, টেকনাফের সাধারণ মানুষও সহজভাবে নিচ্ছে না৷ এটার কোথাও ভুল রয়েছে৷ তদন্ত করে সেটা বের করতে হবে৷ আমি তো মনে করি, একটা ভালো অভিযান বিতর্কিত করার জন্যই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে৷ কারণ, এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এক সময় এই অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে৷'' তিনি বলেন, ‘‘আপনারা তদন্ত করে দেখুন যারা ইয়াবা ব্যবসা করে তারা ফুলে-ফেঁপে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে৷ আর একরামের সম্পদ দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন সে ইয়াবা ব্যবসা করত কি-না৷ ভুল করে তাঁকে মারা হয়েছে৷’’

গত শনিবার রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়া পাড়ায় র‌্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন ৪৬ বছর বয়সি একরামুল হক৷ তিনি টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী পাড়ার মৃত আবদুস সাত্তারের ছেলে এবং স্থানীয় ওয়ার্ডের পর পর তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর৷ দীর্ঘ দিন তিনি টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন৷ একরামুল নিহত হওয়ার পর র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর বাবার নাম আবদুস সাত্তারের জায়গায় লেখা হয় মোজাহার মিয়া ওরফে আবদুস সাত্তার৷ ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ‘তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ এবং ‘ইয়াবার শীর্ষ গডফাদার’ আখ্যায়িত করে বলা হয়, ‘‘একরামের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদক আইনে একাধিক মামলা আছে৷’’

তবে টেকনাফ থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একরামুলের বিরুদ্ধে এক সময় টেকনাফ থানায় দু'টি মামলা ছিল৷ এর মধ্যে একটি মারামারির ঘটনায় এবং অন্যটি মাদক আইনে৷ মারামারির ঘটনার মামলাটি ইতোমধ্যে আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে৷ আর মাদকের মামলাটিতে তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে৷ মৃত্যুর আগে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না।

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘‘বন্দুকযুদ্ধের পর আমরা গুলিবিদ্ধ একটা লাশ উদ্ধার করি৷ তখন স্থানীয় লোকজন শনাক্ত করেন তিনি টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক৷ একরাম র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে৷ র‌্যাবও পালটা গুলি করেছে৷ তার বাবার নাম স্থানীয় লোকজন যা বলেছে সেটাই লেখা হয়েছে৷ বাবার নাম ভুল মানে তিনি যে একরাম নন তা তো নয়৷ পরে খোঁজ নিয়ে আমরা জেনেছি, ৪/৫ তালিকায় শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে তার নাম রয়েছে৷'' স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘‘ইয়াবা ব্যবসার সুফল অনেকে পায়৷ ফলে অনেকেই এখন বড় বড় কথা বলছেন৷’’ একরামের আর্থিক বষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘আগে আলো নামে একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেল৷ পরে তার অ্যাকাউন্ট খুঁজে দেখা গেল ১২০ কোটি টাকা রয়েছে৷ তাই একরামের টাকা কোথায় আছে, কী করেছে সেটা তো অন্যরা বলতে পারবে না৷’’
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল বাশার বলেন, ‘‘অর্থনৈতিকভাবে তেমন স্বচ্ছল ছিলেন না বলে একরামুল নিজের বাড়ি নির্মাণের কাজ দুই দশকেও শেষ করতে পারেননি৷ প্রতিমাসে নিজের সন্তানের স্কুলের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হতো তাঁকে৷ তাই একরামুলকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বলাটাও হাস্যকর৷ এই মৃত্যুর ফলে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে৷’’

নানা বিতর্কের মধ্যেই অব্যহত রয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান৷ সর্বশেষ সোমবার রাতে আরও ১২ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় দু'জন, কুষ্টিয়ায় দু'জন, যশোরে দু'জন, ঢাকায় একজন, ময়মনসিংহে একজন, সাতক্ষীরায় একজন, বরগুনায় একজন, ঠাকুরগাঁওয়ে একজন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন মারা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযান শুরুর পর এ নিয়ে গত ১০ দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৩ জন৷ নিহতরা সবাই মাদক কেনা-বেচায় জড়িত বলে দাবি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর৷ তবে তাদের বক্তব্য ও ঘটনার বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো৷

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন