বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ ১২:১৩:৩০ পিএম

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিতর্কে আ.লীগ-বিএনপি

রাজনীতি | শুক্রবার, ২৯ জুন ২০১৮ | ০১:৫৫:০০ পিএম

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ভারত। ’৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল প্রকৃত বন্ধুর মত। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের সম্পর্কও সঙ্গত কারণেই পুরোনো। তারই ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে বলা যায় বরাবর। এমনকি ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি এবং ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে আনার ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল- এটা সবাই জানেন। অবশ্য এর আগে ২০০১ সালে বিএনপিকে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রেও ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল বলা হয়ে থাকে। কিন্তু ২০০৯ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের যে প্রভাব ও ভূমিকা- তাতে সরাসরি অভিযোগ করার মত চরম কিছু ঘটেনি। যা ঘটেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ভারত আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে শক্তি প্রয়োগ করেছে। ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘ভোটারবিহীন একতরফা’ নির্বাচনে ভারত একচেটিয়া সমর্থন দিয়েছে। যা দেশের গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার চরমভাবে ব্যাহত করেছে। এ নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। এরই মধ্যে সরকারের ৫ বছর শেষ হতে চলেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ টালমাটাল ও ঘোলাটে। ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও আছে নানা শঙ্কা। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ একাধিক মন্ত্রী ও পরে দলীয় প্রধান ভারত সফর করেছেন। এর পর পরই বিএনপির শীর্ষ তিন নেতার দেশটিতে সফর নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ তোলপাড় চলছে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানিয়ে এসেছে। যদিও ভারতের ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। অপরদিকে বিএনপি চায়, ভারত যেন বাংলাদেশের কোনো একক দলের সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। একই সাথে বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও সবার অংশগ্রহণে হয়- সেক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা দেখতে চায় দলটি। পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে একের পর এক রাজনৈতিক মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে কারাগারে আটকে রাখায় দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের কথাও ভারতসহ মিত্র দেশগুলোকে জানিয়েছে বিএনপি। সেই সাথে সিঙ্গাপুর হয়ে বিএনপি মহাসচিবের লন্ডন সফর নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার খোরাক যুগিয়েছে। যদিও এসবের ফলাফল অনির্ধারিতই রয়ে গেছে। এদিকে এমন অভিযোগ উঠেছে যে, আওয়ামী লীগ আবারও ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচনের দিকে হাঁটছে। কারণ, তারা ক্ষমতা ছাড়ার কথা কোনক্রমেই ভাবতে পারছে না। ক্ষমতা পরবর্তী পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, এ নিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীরা চরমভাবে শঙ্কিত। তাই যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করতে হবে। এমন মানসিকতা নিয়ে এগুচ্ছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু যতোটা জানা গেছে, ক্ষমতায় কীভাবে টিকে থাকা যাবে- এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনও পথও এ পর্যন্ত বের করতে পারেননি ক্ষমতাসীন দলের নীতি-নির্ধারকরা। ফলে সময় যতই ঘনিয়ে আসছে দল ও সরকারের মধ্যে অস্থীরতা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটির রায় হাইকোর্টে চূড়ান্ত করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য করার একটি প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে শুনানির জন্য এ মামলাটি কার্যতালিকায় আনা হয়েছে। শুধু সাজা বহালই নয়, সাজা বাড়ানোরও চেষ্টা করা হবে। এমনকি বেগম খালেদা জিয়াকে শুধু নির্বাচনে অযোগ্য করাই নয়, বিএনপিকে নির্বাচনে অযোগ্য করা যায় কিনা সেই চিন্তাও করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।

তবে এ সব কিছুই নির্ভর করছে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক সমীকরণের উপর। ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর শেষ পর্যন্ত ভূমিকা কী হয় তার উপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে। বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা কী হয় সেদিকেই তাকিয়ে আছে অনেকে। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয়ই ভারতের সমর্থন পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

বিএনপি নেতাদের আলোচিত ভারত সফর
বিএনপি নেতাদের ভারত সফর নিয়ে রাজনীতির মাঠে চলছে নানামুখী হিসাব-নিকাশ আর গুঞ্জন। ভারত মিশনে বিএনপির কূটনৈতিক-রাজনৈতিক দর্শন ও নতুন চিন্তা-ভাবনার নানা দিক নিয়ে রাজনীতি সচেতন নাগরিকদের মাঝে চলছে চুলচেরা আলোচনা-পর্যালোচনা। টকশোতে বিষয়টি সরব হয়ে উঠেছে। দলের চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই তিন প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতাদের ভারত সফর গভীর তাৎপর্য বহন করছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব রাখে ভারতের এমন কয়েকটি বেসরকারি থিংক ট্যাংক সংস্থার আমন্ত্রণে গত ৩ জুন বিএনপির সিনিয়র তিন নেতা ভারত সফরে যান। তারা ৬ দিন দিল্লিতে ছিলেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক ভারত সফরসহ বিএনপির পক্ষ থেকে কূটনৈতিক পর্যায়ে যেসব বক্তব্য ও প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে- এতে জাতিসংঘের চার্টার ও জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহ বাংলাদেশে অনুপস্থিত, সেটি তুলে ধরা হয়। সেই সাথে বাংলাদেশের মিত্রদের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে, দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, ভোটাধিকার হারিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বৈরশাসক। সরকার ‘জনগণের বিপরীতে’ অবস্থান নিয়েছে। তারা মানবাধিকার, আইনের শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সমগ্র বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাসমূহ, জাতিসংঘের জেনেভা রিপোর্ট, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট রিপোর্টে তথ্য-প্রমাণাদি সহকারে তাই তুলে ধরছে বিএনপি।

ভারত সফর এবং সেখানকার আলোচনা বৈঠক সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেছেন, ‘ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। দুই দেশের জনগণের সঙ্গে প্রকৃত সম্পর্ক এবং দেশের সঙ্গে দেশের। সম্পর্কের ভিত্তি তো কোনো দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে নয়। সেই ধরনের সম্পর্কে টেকসই বন্ধুত্ব হয় না। বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও এটা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে উভয় দেশের জনগণের মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তা খোলামনে আলোচনা হয়েছে ওই বৈঠকে।’ দেশ ও জনগণের পক্ষে অবস্থানের কারণেই বিএনপিকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ‘ভারতবিরোধী দল’ হিসেবে অপপ্রচার চালানো হয় বলে দলটির নেতারা মনে করেন। আবার ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থন আছে’ এ ধরনের প্রপাগান্ডা ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা হয়। যা দুই দেশের সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয় বলেও মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য। বিএনপির ওই নেতার মতে, ভারত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রতিবেশী দেশ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ভারতের জোরালো সমর্থন জনগণের কাছে প্রত্যাশিত। তিনি বলেন, ‘শুধু ভারতই নয়- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্যের মতো বন্ধু দেশগুলোর সাথেও আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আলোচনায় আমরা ওই বার্তা তুলে ধরছি।’

ভারত সফরকালে বিএনপি নেতৃবৃন্দ দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত সমস্যাগুলো আলোচনার টেবিলে আনায় সমাধানের পথ সুগম হবে বলে তাদের মত ব্যক্ত করেন। এরফলে উভয় দেশ ও জনগণের সম্পর্কের আশানুরূপ উন্নতি হবে। অতীতের ভুল, তথ্য-বিভ্রাট ও প্রপাগান্ডা থেকে বাস্তবতার নিরিখে বেরিয়ে আসা উভয় দেশের মানুষের কল্যাণেই প্রয়োজন বলে মনে করছে দলটি।


বিএনপির তিন সদস্যের এই দলের নেতৃত্ব দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, ভারতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কয়েকটি থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে তারা দিল্লি সফর করেন। এর মধ্যে রয়েছে- বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউট, বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন, ভারত সরকারের থিংক ট্যাংক আইডিএস, ওআরএফ, কংগ্রেসের রাজীব গান্ধী কনটেম্পোরারি ইনস্টিটিউট। থিংক ট্যাংকের শীর্ষ নীতি-নির্ধারক, গবেষক ও বিশ্লেষকদের সাথে আন্তরিক পরিবেশে তাদের আলাপ-আলোচনা, প্রশ্নোত্তর, ভাবের আদান-প্রদান হয়। তারা সেখানে কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করেননি, সবকিছুই আলোচনায় উঠে এসেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশের জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি, অবিশ্বাস, সম্পর্ক বিনষ্টের কারণ ও প্রতিবন্ধক হিসেবে যেসব বিভিন্ন প্রচার-প্রপাগান্ডা এবং তথ্যের বিভ্রাট চলে আসছে, আলোচনায় তাও আমরা চিহ্নিত করেছি। ভারতের থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারকরাও বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা, বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী পরিবেশ কতটা কী রয়েছে সেসব বিষয় গবেষণা ও আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে নিয়েছেন। তারা চান- এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে। এই থিংক ট্যাংকের তথ্য-উপাত্তগুলোই ভারতের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ভারতের সঙ্গে বিএনপির নতুন মাত্রায় এই আলোচনার ধারা অব্যাহত রাখা উভয় দেশের জনগণের স্বার্থেই প্রয়োজন।’

ভারত অবস্থান পাল্টাচ্ছে
প্রায় দুই মাস আগে ভারতের একটি প্রভাবশালী সাপ্তাহিকে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ঠিক ‘যদি বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন কী হবে?’ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুজন বিশ্লেষক, যারা কাজ করেন একটি ফরেন পলিসি থিংক ট্যাংকের সঙ্গে। মেইনস্ট্রিম উইকলি’তে প্রকাশিত এই নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল, ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ: হোয়াট ইফ বিএনপি রিটার্নস’। এর ঠিক এক মাস পরে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি সফরে দফায় দফায় কথা বলেছেন কীভাবে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায়, সেটা নিয়ে। একই সময়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছুটে যান লন্ডনে, যেখানে গত প্রায় ১০ বছর ধরে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অবস্থান করছেন।

ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’তে একই সময়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যার মূল কথা, ‘বিএনপি নেতারা ভারতের কাছে সাহায্য চাইছেন বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে।’

এদিকে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক, লেখক ও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে, বিএনপি ভারতের আস্থা অর্জনে নতুন করে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বিএনপির নেতাদের কথাতেও তার আভাস মিলছে। আর এর পাশাপাশি ভারতের নীতিনির্ধারকরাও বাংলাদেশে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিকে বিবেচনায় রাখতে চাইছেন। বিএনপি যে বাংলাদেশে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি, তারা যে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, আবারও বাংলাদেশে সরকার গঠন করতে পারে, এই বিবেচনাগুলো কিন্তু ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকরা একেবারে বাদ দিতে চাইছেন না। বিবিসি বলছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহ খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক এসএনএম আবদী। ভারতের নামকরা সাময়িকী আউটলুকের সাবেক ডেপুটি এডিটর তিনি। ভারত তার ‘সব ডিম’ এক ঝুড়িতে রেখেছে এটা তিনি বিশ্বাস করেন না। তার মতে, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত একটি বিকল্প দৃশ্যপটের জন্যও তৈরি। ভারত বিএনপিকে খারিজ করে দেয়নি। ভারত অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। বিএনপি শুধু নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও যেসব শক্তি আছে, যেমন এরশাদ, এমনকি জামায়াতে ইসলামির সঙ্গেও। ভারত তাদের সঙ্গে পর্যন্ত কথা বলে।’ এসএনএম আবদীর মতে, “মূলত তিনটি শহরে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা কথা বলেন ও যোগাযোগ রক্ষা করেন; ঢাকায়, লন্ডনে আর দিল্লিতে। এটা কূটনীতিকরা করেন, এটা রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং বা ‘র’ করে এবং পলিটিক্যাল লেভেলেও এই আলোচনা চলে। লন্ডনে যেসব লোকজন ভারত সরকারের খুব ঘনিষ্ঠ, বিশেষ করে বিজেপি এবং আরএসএস এর নেতৃবৃন্দ, তাদের মাধ্যমেও এসব যোগাযোগ হয়।” বিএনপির সঙ্গে ভারত যে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করে, সেটিকে আওয়ামী লীগ মোটেই সুনজরে দেখে না বলে মনে করেন তিনি। এই বিশ্লেষকের মতে, ‘ভারতের নতুন হাইকমিশনার হয়ে শ্রীংলা যখন ঢাকায় গেলেন, তিনি কিন্তু খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন, যেটা আওয়ামী লীগের পছন্দ হয়নি। গত বছর যখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকায় গেলেন, আওয়ামী লীগ একদম চায়নি উনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু এই সফরের আগেই তখন লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়াকে বার্তা দেয়া হয় যে, সুষমা স্বরাজ তার সঙ্গে ঢাকায় সাক্ষাৎ করতে চান। খালেদা জিয়া তখন ঢাকায় ফিরে আসেন। আর সুষমা স্বরাজ তখন দেখা করেন তার সঙ্গে।’ এর সূত্র ধরে বিএনপির ভারত নীতিতেও পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন আবদী। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘গত দুই বছরে আপনি কি বিএনপি নেতাদের কাউকে ভারতের সমালোচনা করতে দেখেছেন? প্রধানমন্ত্রী মোদীর সমালোচনা করতে দেখেছেন? তারা করেননি। সর্বোচ্চ যেটা তারা করেছেন, তা হলো, তারা শেখ হাসিনার সরকারের সমালোচনা করেছেন, ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি আদায় করতে ব্যর্থতার জন্য। হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে আক্রমণের বেশি আর বিএনপি যায়নি। ভারতের সমালোচনা তারা আর করছে না।’

আ.লীগে ‘মাথাব্যথা’
ভারতের সঙ্গে বিএনপির কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের প্রবীণ নেতা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘যে দল সমসময় ভারতের সমালোচনা করে তারা এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে।’ এসব দৌড়ঝাঁপ না করে বিএনপিকে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। তোফায়েল বলেন, ‘এই দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বিদেশিরা কখনো অন্য দেশের নির্বাচনে হন্তক্ষেপ করে না। অতীতেও করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।’ তবে বিএনপির তিন নেতার ভারত সফর নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোনো ‘মাথাব্যথা নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘জনগণ ক্ষমতায় বসাবে, ভারত না। বিএনপি আমাদের ভারত সফর নিয়ে অভিযোগ করেছে। কিন্তু আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।’

বিএনপি মহাসচিবের লন্ডন সফর
এদিকে ১২ জুন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লন্ডন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। এর আগে ৩ জুন তিনি ব্যাংককের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। ব্যাংকক থেকে পরে তিনি লন্ডন যান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। সেখানে একটি সেমিনারেও অংশ নেন মির্জা ফখরুল। এর মধ্যে ১১ জুন লন্ডনে এক ইফতার মাহফিলে দলের নেতাকর্মীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন সূর্যোদয় হবেই।’ এ সময় দেশে সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চলার কথা তুলে ধরে তাতে সফল হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিএনপি মহাসচিব। ওই অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বিতর্ক
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন সড়কের পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে গুরুত্বর অসুস্থ। প্রথমে বিএনপি ও বেগম জিয়ার আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এ কথা বলা হলেও এখন সরকারও তা স্বীকার করছে। কিন্তু তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা কোথায় হবে? সরকারি হাসপাতালে নাকি তার পছন্দের বেসরকারি হাসপাতালে- এ নিয়ে বিতর্ক আর শেষ হচ্ছে না। আর রাজনৈতিক বিতর্কের জালে আটকে আছে কারাবন্দী বেগম জিয়ার চিকিৎসা সেবা।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী নন খালেদা জিয়া, এ কথা জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ এর আগে জানিয়েছিল যে, খালেদা জিয়াকে ১২ জুন কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া জন্য নিরাপত্তার যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি নন। ওইদিন সকাল ১০টার দিকে কারাগার থেকে বেরিয়ে কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, ঢাকার গুলশানে অবস্থিত ‘বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও চিকিৎসা নিতে রাজি নন খালেদা জিয়া।’ কারাবিধি অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালে বেগম জিয়ার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক। তার মতে, সেক্ষেত্রে ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ অনুমোদনের প্রয়োজন আছে।
এদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, কারাবন্দীদের বিশেষায়িত বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার অনেক রেকর্ড রয়েছে অতীতে। এটা নতুন কিছু নয়। ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কারাগার থেকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছিল। তৎকালিন আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলকে ল্যাব এইডে নেয়া হয়েছিল। অনেক নেতাদের বারডেম হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে সরকারের মন্ত্রীরা যেসব যুক্তি তুলে ধরছেন, সেটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার প্রশ্ন, ‘যেসব মন্ত্রীরা এ কথা বলছেন, তারা অসুস্থ হলে বিএসএমএমইউতে যান কি-না? তারাও তো ঢাকায় চিকিৎসা নিলে ইউনাইটেড, স্কয়ার কিংবা অ্যাপোলোতে যান।’

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক সৈয়দ ওয়াহিদুর রহমান বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অন্যতম। তার ইউরিন-এ বারবার সংক্রমণ হচ্ছে, কিডনি দুর্বল হয়ে গেছে এবং রাতে জ্বর আসে। ওনার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। যেমন- এমআরআই করা দরকার। ওনার দুই হাঁটুতেই আর্টিফিশিয়াল প্রসথেসিস করা আছে, যেটা নরমাল এমআরআই মেশিনে হবে না। এখানে সরকারি-বেসরকারি ব্যাপার না। বিষয় হচ্ছে পরীক্ষাগুলো এমন এক জায়গায় করতে হবে যাতে সবকিছু একসাথে করা যায়। বিএসএমএমইউতে ওই ধরনের এমআরআই মেশিন নেই। এটা সমস্যা হবে।’ তার মতে, খালেদা জিয়া যেহেতু ইউনাইটেড হাসপাতালে অনেক আগে থেকেই চিকিৎসা করাতেন। সেজন্য সেখানকার চিকিৎসকরা খালেদা জিয়ার যেমন পরিচিত, তেমনি পরিবেশেও পরিচিত। তিনি বলেন, ‘পেশেন্টের (রোগীর) চয়েস তো সারা পৃথিবীতে আছে।’
এদিকে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার আবেদন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করলেও সেটি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া ‘মাইল্ড স্ট্রোকে’ আক্রান্ত হয়েছেন- এ কথা উল্লেখ করে শামীম ইস্কান্দার চিঠিতে লিখেছেন, ‘ভবিষ্যতের জন্য এ ধরনের বিষয় বড় রকমের ঝুঁকির পূর্বাভাস বহন করছে।’ ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সব ব্যয়ভার তিনি বহন করবেন বলে নিশ্চয়তা দেন। এ আবেদনকে অযৌক্তিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি খালেদা জিয়াকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার প্রস্তাব দেন। তবে বেগম জিয়া সেখানে চিকিৎসা নিতে রাজি নন। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা কোথায় হবে বা আদৌ হবে কি-না; সেই অনিশ্চয়তা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাটেনি।

(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ২৫ জুন ২০১৮ প্রকাশিত)

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন