বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮ ০৩:৫১:৪৬ পিএম

খালেকের রেকর্ড ভাঙলেন জাহাঙ্গীর, এরপর কী?

রাজনীতি | শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮ | ০২:২০:৫৬ পিএম

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : খুলনা থেকে গাজীপুর। কোনো নির্বাচন নয়। এ যেন ‘ভোট ডাকাতির’ নতুন রেকর্ড তৈরির প্রতিযোগিতা! তালুকদার আবদুল খালেক যা ‘সৃষ্টি করলেন’ তা ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়লেন গাজীপুরের জাহাঙ্গীর আলম। সামনে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এতে নতুন কোনো সংস্করণ যোগ হবে; না কি খালেক আর জাহাঙ্গীরের দেখানো পথেই হাঁটবেন এই তিন সিটির সরকার দলীয় মেয়রপ্রার্থীরা? নাকি ‘আজ্ঞাবহ ও মেরুদ-হীন’ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বোধোদয় হবে? ঘুমন্ত বিবেক ফিরে পাবেন, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন ইসির কর্তাব্যক্তিরা? কী হবে পরবর্তী তিন সিটি নির্বাচনে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাধারণ নাগরিক, সুশীল সমাজ, কূটনৈতিক মহলসহ সারা দেশে এখন আলোচনা তা নিয়েই। এমনকি সরকারি অফিস-আদালতেও বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা আর পর্যালোচনা তুঙ্গে।
অনেকে বলছেন, যা আগে কেউ ভাবেননি, খুলনা আর গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের নামে তাই হয়েছে। অবশ্য ভোটকেন্দ্র দখল বা জালভোট এবারই প্রথম নয়। বিগত দিনেও নির্বাচনের নামে ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা কম ঘটেনি। তবে ধরণ আলাদা। আগে দখলকারীদের প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে। সংঘর্ষ হয়েছে। হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সরকারের প্রতিপক্ষের লোকজনকে ভোটকেন্দ্র থেকে ‘সাদাপোশাকে’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নেওয়ার ইতিহাস গাজীপুরেই প্রথম। এমনটি খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও হয়নি। অবশ্য, খুলনা-গাজীপুর উভয় ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্বে ‘ভোট ডাকাতি’র অভিযোগ মিলেছে। এর আগে আইনশৃঙ্খালা বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালনের অভিযোগ শোনা যেত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখলে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা আগে কেউ এতটা শুনেননি। এমনটা কেউ আগে হয়তো কল্পনাও করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, খুলনা ও গাজীপুরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তফসিল ঘোষণার পর কমিশনের অধীনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকার কথা। ইসির নির্দেশ মেনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের তৎপরতা চালানোর বিধান থাকলেও হয়েছে উল্টো। কমিশনকে দেখা গেছে সরকারি দল ও শৃঙ্খলাবাহিনীর অপকর্মকে বৈধতা দিতে। নির্বাচন কমিশনারদের কথাবার্তাও জাতিকে হতাশ করেছে। উভয় ক্ষেত্রেই তারা বলেছেন, ‘নির্বাচন সুন্দর ও সুষ্ঠু হয়েছে।’ যদিও খুলনার নির্বাচনের পর দেশীয় গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভোট ডাকাতি ও কেন্দ্র দখলের বাস্তবচিত্র তুলে ধরার পর ইসি তদন্ত কমিটি করে। সেই কমিটি তদন্ত শেষে কেন্দ্র দখল, জালভোটসহ সীমাহীন অনিয়মের প্রমাণও পায়। গাজীপুরের নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু’ বলা হলেও ভোটের দিনই ৯টি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করতে হয়েছে। আর নির্বাচন ওয়ার্কিং গ্রুপ বলেছে, গাজীপুরে সাড়ে ৪৬% কেন্দ্রে ভোটে জালিয়াতি ও অনিয়ম হয়েছে। এমনকি গাজীপুরের নির্বাচিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও ১৪ দলের মুখপাত্রও স্বীকার করেছেন ‘গাজীপুরে কিছুটা অনিয়ম হয়েছে’। কিন্তু ইসির ভিন্ন বক্তব্য এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে ইমেজ সংকটে ফেলবে বলে বিশ্লেষকদের মত। কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, তিনি নাকি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সংজ্ঞা জানেন না। বিশেষ করে রফিকুল ইসলামের এ বক্তব্য পুরো নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকেই চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, তাদের আশা ছিল, খুলনার ভোট থেকে শিক্ষা নিয়ে গাজীপুরে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দেবে ইসি। কিন্তু তা হয়নি। নির্বাচনের বাস্তবচিত্র দেশীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি বিবিসির প্রতিবেদনে মোটামুটি ফুটে উঠলেও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ ক্ষেত্রেও খুলনার মতো অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। আর বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত খুলনার পর গাজীপুরের নির্বাচনে অনিয়ম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও সরকার তা পাত্তা দিতে চাচ্ছে না। মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ‘নিজ চরকায় তেল দেওয়ার’ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এমন প্রেক্ষাপটে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সামনের তিন সিটির নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছে ইসির প্রতি।
কেমন ভোট হলো গাজীপুরে?
গত ২৬ জুন প্রকাশ্যেই কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারার ‘মহাকর্মযজ্ঞ’ দেখালেন সরকার দলীয় গাজীপুরের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। যা এর আগে খুলনায় অনুষ্ঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীন বিতর্কিত নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। তারা বলছেন, নির্বাচনে অনিয়মের নতুন স্টাইল দেখালো গাজীপুর। নৌকায় সিল মারা ব্যালট পেপার ভোটারদের সরবরাহ, মেয়রপ্রার্থীর ব্যালট পেপার না দিয়ে শুধু কাউন্সিল প্রার্থীদের ব্যালট পেপার সরবরাহের ঘটনাও ঘটেছে গাজীপুরে। নারী কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন পুরুষ। ভোট শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যে ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দেওয়া, আড়াই ঘণ্টার মধ্যে সব কেন্দ্র দখলে নেওয়া, দুই ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রের ব্যালট পেপারে সিল মারা সম্পন্ন করার দৃষ্টান্তসহ কারচুপির অভিনব সব কৌশল প্রয়োগ হয়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে। ফলে দেশবাসীর কাছে এখন নির্বাচনের নতুন রূপ গাজীপুর।

গাজীপুরে সকাল ১০টার মধ্যে ৮০% কেন্দ্রে থেকেই বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে সাদাপোশাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগও আছে। তবে প্রতিটি কেন্দ্রেই সিলমারার ব্যাপারে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের উত্তর ছিল প্রায় একই- ‘আমি কিছু জানি না। কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।’
গাজীপুরে ৪২৫টি ভোটকেন্দ্রের অধিকাংশ কেন্দ্রেই ব্যালট পেপার ছিনতাই, জালভোট, কেন্দ্র দখল, বিরোধী পক্ষের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, জোর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ধানের শীষের ব্যাচ ছিনতাই করে নৌকার লোক বিএনপির এজেন্ট সেজে বসে থাকা এবং বিএনপির নির্বাচনী কেন্দ্র পর্যন্ত দখল করে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলেও মাত্র ৯টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। পরে ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, ৫৭টি ওয়ার্ডের মোট ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১৬টিতে জাহাঙ্গীর আলম নৌকায় পেয়েছেন ৪ লাখ ১০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীপ্রার্থী বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার ধানের শীষে পেয়েছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১ ভোট।

বিএনপি নেতা ও উধাও হয়ে যাওয়া এজেন্টদের অনেকের সঙ্গে পরে কথা বলে জানা গেছে, কাউকে ভোটের আগের রাতে, ভোটের দিন ভোরে বাড়ি থেকে, সকালে কেন্দ্রের ভেতর ও বাইর থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তুলে নিয়ে গোপন স্থানে রেখে ভোট শেষ হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, এমন ৪২ জন সম্পর্কে জানা গেছে, তারা বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট বা কেন্দ্র কমিটির সদস্য ছিলেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন- আঞ্জুমান হেদায়েতুল উম্মত কেন্দ্রের এজেন্ট হাবীবুর রহমান, টিডিএইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের এজেন্ট ফারুক হোসেন, ধীরাশ্রম জিকে আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের এজেন্ট সেলিম রেজা, সাহারা খাতুন কিন্ডারগার্ডেন কেন্দ্রের এজেন্ট মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম, ধূমকেতু স্কুল কেন্দ্রের এজেন্ট আবদুল হামিদ, শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র থেকে সাবেক পৌর কমিশনার শরিফ মিয়া, শরিফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে মনির হোসেন, টঙ্গী থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি শাহাব উদ্দিন, আমবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে শ্রমিক দলের নেতা বজলুর রহমান, পুবাইল রোমানিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্র থেকে খোরশেদ মিয়া, সাবেক কাশিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল আজিজ মাস্টার; ধূমকেতু কেন্দ্র থেকে শাহাব উদ্দিন, ক্যারিয়ার লাইফ স্কুল কেন্দ্রের আবদুল কাদির, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের আহম্মদ, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড ভোগড়া মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে গিয়াস উদ্দিন, টঙ্গী কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্র থেকে সোহাগ প্রমুখ।

ভোটের দিন সকালে টঙ্গীর নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রবেশের সময় আটক করা হয় বিএনপির প্রার্থীর এজেন্ট আলমগীর হোসেনকে। একইভাবে আরিচপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র কমিটির সদস্য কাজী শাহীন, বনমালা এলাকা থেকে ছাত্রদলের নেতা রাজন ও বিএনপির কর্মী জাকির এবং ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক কাজী নজরুলকে। এছাড়া টঙ্গী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম ও শিমুলতলী কেন্দ্রের প্রধান এজেন্ট মোতালেব, মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা কেন্দ্রের এজেন্ট মো. মুন্নাকে ভোটের আগের সন্ধ্যায় বিলাসপুর বটতলা থেকে আটক করা হয়। ভোট শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর মুন্নাসহ ছয়জনকে কাপাসিয়া রোডের এক জায়গায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৩১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আইনজীবী হাসানুজ্জামান জানান, ‘২৯ নম্বর ওয়ার্ডের আমির হোসেন, তৈজউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রর এজেন্ট আবু বকর সিদ্দিককে ভোট শুরুর পর কেন্দ্র থেকে ডেকে নিয়ে আটক করা হয়। পরে অনেক রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
তুলে নেওয়া ও ফেরার অভিজ্ঞতা
৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের গাছা কলমেশ্বর আদর্শ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভেতর থেকে ভোটের দিন দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ধানের শীষের এজেন্ট মোহাম্মদ ইদ্রিছ খানকে তুলে নেন সাদাপোশাকের একদল ব্যক্তি। ইদ্রিছ খান বলেন, ‘ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে চার ব্যক্তি ‘কথা আছে’ বলে তাকে ঘরের বাইরে আসতে বলেন। বাইরে গেলে একজন এসে তার বাঁ হাত ধরেন। আরেকজন কাঁধে ধরে হাঁটতে বলেন।’ এ সময় তিনি জানতে চান, ‘ভাই, কোনো সমস্যা?’ জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘সমস্যা না, আপনাকে হেল্প করছি। নিরাপদে সরিয়ে দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, পরে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে আমাকে তোলা হয় এবং একটি লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করা হয়। চান্দনা চৌরাস্তা পুলিশ বক্সের কাছে এলে নামিয়ে একই ধরনের আরেকটি গাড়িতে তোলা হয়। পরে জেলা পুলিশ লাইনের একটি বড় কক্ষে নিয়ে রাখা হয়।’ ইদ্রিছের ভাষ্য, সেখানে তার আগে নিয়ে যাওয়া হয় ৩৬ জনকে। তিনি ৩৭ নম্বর। তারপর আরও ৫ জনকে সেখানে নেওয়া হয়। ওই কক্ষে মোট ৪২ জন ছিলেন বলে ইদ্রিছের দাবি। ইদ্রিছ খান বলেন, “বিকেল সাড়ে চারটার দিকে একজন এসে বললেন, ‘আপনারা চিন্তা করবেন না। সবাইকে একটু দূরে নিয়ে ছেড়ে দেব।’ এরই মধ্যে সাত-আটটি বড় মাইক্রোবাস গাড়ি আনা হয়। একটা গাড়িতে ছিলাম আমরা ছয়জন এবং ডিবি পুলিশ ছিল চারজন।” ইদ্রিছ বলেন, সন্ধ্যায় তাদের তিনজনকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার বগমারা এলাকায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে রাতে বাসায় ফেরেন। কাশিমপুরের আবদুল আজিজ মাস্টারসহ বাকি তিনজনকে নিয়ে ভালুকার দিকে চলে যায়।
অবশ্য গাজীপুর পুলিশ লাইনের আবাসিক পরিদর্শক (আরআই) আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, তিনি ভোটের দায়িত্ব পালনে বাইরে ছিলেন। বিষয়টি তার জানা নেই। আর গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন-অর রশিদ বলেছেন, ‘কারও বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ থাকলে তো পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে। আসামি ধরে নিয়ে ছেড়ে দেব কেন?’
এদিকে ভোটের আগের দিন সন্ধ্যায় শহরের ধীরাশ্রম এলাকা থেকে ৬ জনকে তুলে নিয়ে যায় সাদাপোশাকের পুলিশ। তারা হলেন- আনোয়ার হোসেন, কবির হোসেন, মজিবুর, হেলেন বাদশা, আলমগীর ও মোশাররফ বাদশা। একই সময় সামন্তপুর এলাকা থেকে আমির, ইকবালসহ চারজনকে তুলে নেওয়া হয়। ভোটের পরের দিন ২৭ জুন তাদের সন্ধান পাওয়া গেছে, ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।

গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
গাজীপুর সিটি নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন মহল বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন একই সুরে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ‘সুন্দর নির্বাচন হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন। যদিও পর্যবেক্ষকরা এটাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন।
সাড়ে ৪৬% কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে : গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাড়ে ৪৬ শতাংশ কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। এই কেন্দ্রগুলোতে ১৫৯টি নির্বাচনী অনিয়মের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে সংস্থাটি। এসব অনিয়মের মধ্যে আছে জোর করে ব্যালটে সিল মারা, ভোটের সংখ্যা বাড়িয়ে লেখা, কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে প্রচার চালানো ও ভোটকেন্দ্রের ভেতর অনুমোদিত ব্যক্তিদের অবস্থান।
২৮ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে এ তথ্য তুলে ধরে ইডব্লিউজি। সংস্থাটি লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, ‘৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে দুপুরের দিকে চারটি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তারা ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে দেন। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সিল মারতে দেখা গেছে। একই কেন্দ্রে বিকেল ৪টার দিকেও সিল মারার ঘটনা ঘটেছে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘৩২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি কেন্দ্রে বেলা ১১টার দিকে পাঁচজন ভোটারকে মেয়র প্রার্থীর ব্যালট পেপার দেওয়া হয়নি। বিএনপির পোলিং এজেন্টদেরও বের করে দেওয়া হয়েছে। একই কেন্দ্রে বেলা একটার দিকে অবৈধভাবে সিল মারতে দেখা গেছে। দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একজন মেয়র প্রার্থীর সরবরাহ করা খাবার গ্রহণ করেছেন। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে সারা দিন কিছুসংখ্যক ব্যক্তি কেন্দ্রের ভেতর ঘোরাফেরা করেছে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গেও তাদের কথা বলতে দেখা গেছে।’
সংস্থাটি বলেছে, তারা ৮৮টি কেন্দ্রে ভোটগণনা পর্যবেক্ষণ করেছে। এর মধ্যে ২১টি ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টরা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ বা আপত্তি জানিয়েছেন। দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তারা ফলাফল শিটে একজন মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বাড়িয়ে লেখেন। ওই সময় বিএনপির এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন না।
ইডব্লিউজি পরিচালক মো. আবদুল আলীম বলেন, ‘রংপুর সিটি নির্বাচনে আমরা কোনো অনিয়ম পাইনি। গাজীপুরে পাওয়া গেছে।’ রংপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জের মতো নির্বাচন দেখতে চান তারা। খুলনা বা গাজীপুরের মতো নির্বাচন প্রত্যাশা করে না কেউ। ইডব্লিউজির সদস্য মো. হারুন অর রশীদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাছে রংপুরের মতো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আমরা প্রত্যাশা করি।’
যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন : ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, ‘খুলনা ও অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের খবরে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন।’ এ ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও পোলিং এজেন্টদের গ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানির বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। বার্নিকাট বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যে নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। আমরা দেখতে চাই, সরকার তার অঙ্গীকার পূরণ করবে।’
আ.লীগ জিতেছে গণতন্ত্র হেরেছে: গাজীপুরের নির্বাচনে নজিরবিহীন ‘ভোট ডাকাতি’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘গাজীপুরবাসী ৮০ বছরের ইতিহাসে এমন ভোট ডাকাতি দেখেনি।’ ৪২৫ কেন্দ্রের মধ্যে চার’শর অধিক কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলেও দাবি তার। এদিকে গাজীপুর সিটিতে নির্বাচনের পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ২৭ জুন সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গাজীপুরে ভোট ডাকাতির নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ হয়েছে। এই নির্বাচন আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। সেই সাথে নতুন করে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ভোটগ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’
একই দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘গাজীপুরে সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ।’ একইভাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও নৌকার এই জয়ের ধারা অব্যাহত থাকবে বলেও আশা করছেন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায় ‘নিজ চরকায় তেল দেওয়া’র পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। একইভাবে ৩০ জুন রাজশাহীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কথা বলার সুযোগ নেই। তার দেশেও নির্বাচন বিতর্ক হয়।’ গাজীপুরের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু হয়েছে’ বলেও এ সময় দাবি করেন এই কমিশনার।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ : খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন (রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল) নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা উচিত বলে মনে করছেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। এছাড়া সিটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দ্বৈতশাসন বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি। সেই সাথে সিটি নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়ালের ৮৪ ধারা পরিবর্তন করতে হবে বলেও মনে করেন সুজন সম্পাদক। নির্বাচনে কারচুপির শঙ্কা নিরসনে ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রে সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাবও করেন তিনি। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এখন সময় এসেছে নির্বাচন কমিশনের বেশকিছু বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’ সিটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দ্বৈতশাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিধিবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন বা কমিশনের পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তা সব কিছুর দায়িত্বে থাকবেন। তার নেতৃত্বে এবং কর্তৃত্বেই সব পরিচালিত হবে। কিন্তু ৮৪ ধারার কিছু অস্পষ্টতার কারণে তা প্রতিফলিত হয় না। নির্বাচনের সময় ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে কমিশনের অধীনে থাকে না। এ ধারায় পরিবর্তন আনলে পুলিশ তখন রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে। তখন পুরো দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব কমিশনের হাতে থাকবে। কমিশন কাউকে চাইলে বদলিও করতে পারবে। মূল কথাই হচ্ছে দ্বৈতশাসনের অবসান হওয়া দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হওয়া ঠিক হয়নি। এতে বিভিন্ন সময় ভোটারদের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হতে দেখা গেছে। স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধ ও সংকট আরও তীব্র আকার নিয়েছে।’ সুজন সম্পাদক বলেন, “কমিশনের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, ‘সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের খাতিরে কমিশন প্রয়োজনে বিধিবিধান সংযোজনও করতে পারে।’ বিধি প্রণয়ন ও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে।”
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন