সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৫:৫০:৫৭ এএম

কয়লা গেলো কোথায়?

জাতীয় | মঙ্গলবার, ২৪ জুলাই ২০১৮ | ০৮:১৬:৫৪ এএম

কম কয়লা তুলে ঠিকাদার কোম্পানি বেশি দেখিয়ে অথবা খনি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেশি বিক্রি করে কাগজে-কলমে কম দেখানোয় বড়পুকুরিয়া খনির কয়লার হিসেব মিলছে না। পেট্রোবাংলা ও বড়পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

খনি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সরাসরি এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অনেকে মনে করছেন। বড়পুকুরিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা হাওয়া হয়ে যাওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে এতো কয়লা গেলো কোথায়? সোমবার সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপ করা হলে তারা এসব তথ্য জানান।

পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘বিপুল পরিমাণ এই কয়লার মধ্য থেকে এক লাখ টন কয়লা বিক্রি করে দেওয়া হলে কোনও সমস্যা হবে না মনে করেই দীর্ঘ দিন থেকে এটা করা হতে পারে। এক বা দুই দিনে এই কাজ করা হয়নি। এটা করতে দীর্ঘ সময় নেওয়া হয়েছে।’তিনি বলেন, ধরা যাক কোনও ক্রেতা ১০০ টন কয়লা নিলো, তাকে ১০০ টনের স্থলে ১১০ টন কয়লা দেওয়া হলো। এখানে ১০ টনের টাকা গ্রাহক এবং বিক্রয় প্রতিনিধির মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকতে পারে। এতে উভয় পক্ষই আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে।



এদিকে বড়পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই ও ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি দুটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কয়লা বিক্রি করা হয়। গত ১৮ মার্চ থেকেই বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে অন্য গ্রাহকদের কাছে কয়লা বিক্রি বন্ধ করা হয়।

এদিকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৫-০৬ সালে বর্তমান স্তর থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করা হয়। গত ১৩ বছরে একবারও কয়লা বিক্রি করার পর ইয়ার্ডে কি পরিমাণ কয়লা আছে রহস্যজনকভাবে তার হিসেব রাখা হয়নি। শুধু উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এক কোটি ২২ হাজার ৯৩৩ মেট্রিক টন কয়লা তোলা হয়েছে তার হিসেব আছে।

তবে বড়পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা প্রথম বছরে তিন লাখ তিন হাজার ১৫ টন কয়লা উত্তোলন করে। পরবর্তী বছর থেকে কয়লা তোলার পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ১১ লাখ ৬০ হাজার ৬৫৭ মেট্রিকটন কয়লা তোলা হয়। এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও কয়লা উত্তোলনের পরিমাণ ছিলো ১০ লাখ ২১ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। এভাবে প্রতি বছরই সাত থেকে নয় লাখ মেট্রিকটন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের গত মার্চ পর্যন্ত ৭ লাখ ৮২ হাজার ২১৪ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। চুরি করে বিক্রির বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সময়ের সঙ্গে কয়লার দাম বৃদ্ধি করা হয়। এতে বিক্রির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা যায়, প্রথমদিকে ২০০১ সালের ২৯ মে কয়লার দাম নির্ধারণ করা হয় কর ছাড়া ৬১ দশমিক ৫০ ডলার। এরপর ২০০৮ সালের জুলাই মাসে এই দাম বাড়িয়ে ৭১ দশমিক ৫০ ডলার করা হয়। এরপর ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ১০৬ ডলার, ২০১৫ সালের ১ মে ১৩১ দশমিক ৫০ ডলার এবং ২০১৭ সালের ১ জুলাই ১৩০ ডলার (কর ছাড়া) কয়লার দাম নির্ধারণ করা হয়।
কয়লা পরিমাপই করা হয়নি তাই এমন সুযোগ অতীতে কারও নেওয়া অসম্ভব নয় বলে পেট্রোবাংলার সাবেক একজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান। তিনি বলেন, এমন দুর্নীতি সব সময়ই হয় না। কোনও কোনও সময় কারও কারও ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে হয়ে থাকতে পারে। তিনি একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে ঠিকাদার কোম্পানির সখ্যতার কথাও জানান।
কয়লা খনির কেউ কেউ মনে করছেন, ঠিকাদার কোম্পানি নির্দিষ্ট কোনও সময়ে কয়লা উত্তোলনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখাতে পারে। এতে কয়লা না তুলেই তারা অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে। আগে প্রতি টন কয়লা তোলার বিপরীতে ঠিকাদার কোম্পানিকে শুরুতে ৫২ ডলার করে পরিশোধ করতে হতো এখন প্রতি টনের বিপরীতে ৮২ ডলার করে পরিশোধ করতে হয়। ঠিকাদার কোম্পানির সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে এমন কোনও ব্যবস্থাপকের সময় এই দুর্নীতি ঘটতে পারে।

এদিকে পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান, সংস্থার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান বলেন, এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যচ্ছে না। এই কয়লা চুরি করে বিক্রি করা হতে পারে বা চীনা কোম্পানি কয়লা নাও তুলতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সবই হতে পারে।’
গত সপ্তাহে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শিফট পরিবর্তন করার কারণে কয়লা তোলা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে কয়লার চাহিদা পূরণের সমান কয়লা মজুত রাখার অনুরোধ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এর পরিপ্রেক্ষিতে খনি কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে জানায়, এক লাখ টন কয়লা মজুত রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রর জন্য কোনও সঙ্কট হবে না। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কয়লা না থাকার বিষয়টি পিডিবিকে জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) সাঈদ আহমেদ পরিদর্শনে গিয়ে কয়লা না থাকার সত্যতা পান। কয়লা না থাকায় বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গত রোববার রাত ১০টা ২০ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন