বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ ১০:০৯:০৫ পিএম

‘সারাজীবন বাস চালাইছি আর বাস চালামু না’

শিক্ষাঙ্গন | মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই ২০১৮ | ০৩:৪৫:০২ পিএম

‘আমাগো অভিভাবক মন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি নাকি আমার মেয়েসহ দুজন মরার কথা বলতে বলতে হাসতে ছিলেন। এই কথা শুইনা আমার দুঃখে বুক ভাইঙা আসছে। আমি আর বাস চালামু না। যেই বাস আমার মেয়েরে নিয়া গেল। সেই বাস আর ধরুম না আমি। আমি সারা জীবন বাস চালাইছি সেই ছোট থাইকা কেউ আমার গাড়িতে অ্যাকসিডেন্ট হয় নাই। আমি তো কাউরে মারি নাই।

মেয়ে হারা এই বাবার চোখ কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে গেছে। চোখ ফুলে গেছে। টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলা শুরু করলেন মেয়ের কথা। জাহাঙ্গীর বলছিলেন, মেয়ে আমার কলেজে গেলে ওর মায়ের কাছে খবর নেই, সে পৌঁছাইছে কি না। এবার বাড়ি আইলে জিগাই আসছে কি না। ওটা প্রতিদিনের রুটিন আমার। আমি ঢাকা-রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জ রুটে একতা পরিবহনের বাস চালাই আজ ২৭ বছর ধইরা।

কাইলকে দুইটার সময় আমি বাস নিয়া যাব চাপাই। যাওয়ার আগে ওর মারে কইলাম মেয়ে আইলে আমারে জানাইও। এই কথা কইয়া আমি বাইর হইছি কেবল। হঠাৎ এক ফোন আইল একটার দিকে। একজন কইল আপনার মেয়ে নাই জলদি আসেন। আমি কেমনে যাব কিসে যাব ভাবতে পারতাছিলাম না। পরে বাসে, রিকশায় বনানী পর্যন্ত গেছি। এক মোটরসাইকেল ওয়ালাকে কইলাম ভাই আমার মেয়ে অ্যাকসিডেন্ট করছে আমারে লইয়া যান। এরপর যা দেখলাম তা আর ভাষায় প্রকাশ করতে পারমু না। গিয়া দেখি আমার মেয়ে আর নাই। জাহাঙ্গীরের চোখে আবার পানি জমে উঠেছে। টিস্যু দিয়ে সেই চোখ মোছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরের ক্লান্ত শরীর মেয়ে হারানোর ব্যথায় যেন কুকরে আসছিল। তিনি বলা শুরু করলেন, মা আমার ভালো ছাত্রী ছিল। এসএসসিতে ভালো করছে। এ প্লাস পাইছে টিঅ্যান্ডটি মহিলা ডিগ্রি কলেজ থাইকা। পরে ওই কলেজে ওর ভর্তি হওয়ার খুব ইচ্ছা। এদিকে ভালো কলেজ নাই। অনেক দূর হয় তাও শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ভর্তি কইরা দিলাম। মেয়েটা খুব খুশি আছিলো। প্রতিদিন কলেজে যায় আসে। আমি খবর নেই ও ঠিকমতো আইছে কি না। একবার গাড়ি নিয়ে আসা যাওয়া করলে ১ হাজার ২৫০ টাকা পাই। অনেক কষ্টের জীবন আমার। ভাড়া দেই. খাবার কিনি। মেয়েকে বুঝতে দেইনাই কষ্টে আছি। শুধু চাইছি মেয়েটা বড় হউক। ওরে নিয়ে কত স্বপ্ন আমার....। জাহাঙ্গীর থেমে যান। অভিমান করে বলেন, এত দিন বাস চালাই কই ফেডারেশনের কেউতো আইল না। মেয়ে মরা বাপ আমি কি কষ্টে আছি কেউ তো খবর নিল না। আমাগো অভিভাবক মন্ত্রী শাহজাহান খান তিনি নাকি আমার মেয়েসহ দুজন মরার কথা বলতে বলতে হাসতে ছিলেন। এই কথা শুইনা আমার দুঃখে বুক ভাইঙ্গা আসছে...। আমি আর বাস চালামু না। যেই বাস আমার মেয়েরে নিয়া গেল। সেই বাস আর ধরুম না আমি। আমি সারা জীবন বাস চালাইছি সেই ছোট থাইকা কেউ আমার গাড়িতে অ্যাকসিডেন্ট হয় নাই। আমি তো কাউরে মারি নাই। তাইলে আমার মতো মানুষের মেয়ের কপাল এমন হইলো কেন?

ঢাকায় যারা বাস চালায় তাদের ঠিকমতো গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নেই বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, খোঁজ নেন এরা হেলপার। দুই দিন বাস চালাইয়া ড্রাইভার হইয়া গেছে। তো এরা মানুষ মারব না তো কি? এদের কোনো ঠিকানা নাই। আপনারা আসল জায়গায় হাত দেন। এই যে নিরাপদ সড়ক চান কি লাভ, আমার মেয়েরে তো ফেরত পামুনা। আপনারা উদ্যোগ নেন। আমি বাস চালানো শিখামু। প্রশিক্ষণ ছাড়া একজনেরও লাইসেন্স দিবেন না। আমি বিআরটিএকে সহায়তা করমু।

মেয়ের কথা বলতে গিয়ে আবার আবেগাপ্লুত হয়ে জাহাঙ্গীর বলেন, আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই। এটাতো দুর্ঘটনা না। পুলিশ আমাকে বলছে মামলা করতে। আমি তো মেয়েরে নিয়া ব্যস্ত। মেয়েরে পোস্টমর্টেম করি নাই। অমনি মাটি দিছি। কি মামলা হইছে জানি না। এখন শুনি দুর্ঘটনা। এটা কেমন দুর্ঘটনা। এটা তো হত্যা, নাকি? আমি কেন সবাই বলব এটা হত্যা।

খবরটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন